করোনা ভাইরাস: বাংলাদেশে চাষ না করে কৃষি জমি ফেলে রাখলে সরকার নিয়ে নেবে, বিজ্ঞপ্তি জারী

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন গত মাসের শুরুতে।

ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, “…যে সমস্ত ভূমি মালিকগন তাদের জমি অনাবাদী/পতিত ফেলে রাখছেন বা রেখেছেন তাদের জমি ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত আইনের ৯২ ধারা মোতাবেক ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত করার আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

অর্থাৎ কেউ যদি তার কৃষিজমিতে চাষাবাদ না করেন তাহলে সেই জমি সরকার নিয়ে নেবে।একই ধরণের একটি ‘গণবিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করেছেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকও।

এতে বলা হয়েছে, “..কোন জমি পতিত রাখা যাবেনা। কৃষি জমি পতিত রাখা আইনের চোখেও একটি অপরাধ। এরপরেও যদি কোনো ব্যক্তি তার জমি কৃষিকাজে ব্যবহার না করে পতিত রাখেন তাহলে উক্ত জমি রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত আইন ১৯৫০ এর ৯২(১) ধারা মোতাবেক খাসকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।”

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো: আসলাম হোসেন বলছেন, তাদের মূল বিষয় হলো প্রত্যেকটি জায়গা যেন আবাদের আওতায় চলে আসে।

তিনি বলেন, মানুষের জমি কেড়ে নেয়া সরকারের উদ্দেশ্য না, উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেকটি জমি যেন ফসলের আওতায় চলে আসে। কারণ এ মূহুর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

“ধরুণ আপনি ঢাকায় থাকেন, গ্রামে জমিজমা আছে। জমিটিতে চাষাবাদ করলেন না, বর্গাও দিলেন না বরং ফেলে রাখলেন। আমরা চাই সেটি চাষাবাদের আওতায় আসুক।”

কি প্রক্রিয়ায় জমি সরকার নেবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে তার বক্তব্য শোনা হবে যে কেন তিনি জমি ফেলে রেখেছেন। তার বক্তব্য শুনে বিবেচনায় নেয়ার মতো হলে সেটি গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, সরকার জমি এভাবে নিলেও পরে তা ভূমিহীনদের মধ্যেই বিতরণ করে।

বাংলাদেশের কৃষিখাতে শ্রমিক ষঙ্কট করোনাভাইরাস মহামারির সময় আরো তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেবে দেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৮৬ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি আবাদযোগ্য হলেও পতিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ খাসজমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে।

জানা গেছে ,সম্প্রতি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নিয়মিত কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধরণের অনুষ্ঠানে তিনি কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের নির্দেশনাও দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে আমলে নিয়ে কয়েকটি জেলা প্রশাসন নিজ এলাকায় গণবিজ্ঞপ্তি জারী করে বলেছে, আবাদী জমি ফেলে রাখলে তা খাসজমি হিসেবে খতিয়ানভুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এই ধরণের বিজ্ঞপ্তি নিজেদের ওয়েবসাইটে গত মাসের শুরুতেই দিয়েছিলো পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী বলছেন কৃষি জমি হলে সেটি দীর্ঘদিন ফেলে রাখার অধিকার জমির মালিকের থাকে না।

“কেউ যদি কৃষিজমি অনাবাদী রাখে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর খাস খতিয়ানভুক্ত হবার আইন আছে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা নানাভাবে সহায়তা করছি। এরপরেও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে আইনের কথা উল্লেখ করে সচেতন করছি।”

মি. চৌধুরী বলেন, এটা চলমান প্রক্রিয়া যে কৃষিজমি অনাবাদী রাখা বা ওয়ারিশবিহীন অবস্থায় মৃত্যু হলে জমি খাস করা হয়। এরপর তা ভূমিহীনদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

এখন চাষাবাদ হচ্ছে কিনা সেটি মনিটরিং শুরু হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন এটা সব সরকারি কর্মকর্তাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের গত ২০শে মে দেয়া এক অফিস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারা দেশে ১৪ জন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ১৪টি অঞ্চলে এ কার্যক্রম মনিটর করবেন।

কৃসিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ফুল ফেলে দিচ্ছেন একজন ফুল চাষী।
এদের প্রধান কাজ হবে অধিক ফসল উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো জমি যেনো পতিত না থাকে সে বিষয়ে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা দেখভাল করা। যদিও কৃষিমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি।

আর ভূমি মন্ত্রণালয় বলছে, এমন কোনো নির্দেশনা তারাও দেননি। যদিও উচ্চপর্যায়ের এক সভায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছিলো। অর্থাৎ কৃষি জমি ফেলে রাখলে সরকার নিয়ে নেবে – এমন সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয়ভাবে কোথা থেকে এসেছে সেটি কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

তবে বেসরকারি সংস্থা এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলছেন, সরকার নিজেই কৃষিজমির অকৃষিখাতে ব্যবহার বন্ধ করেনি, এমনকি তার হাতে থাকা খাস জমিও কৃষিকাজে ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেনি।

“কোনো মালিক কোনো কারণে আবাদ করতে পারলেন না। অসুস্থতা বা কোনো দুর্ঘটনার কারণে করতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে সরকার সেটা খাস জমি করে দেবে এটা হতে পারে না। খাস জমি করতে কিছু প্রক্রিয়া আছে। অধিগ্রহণেরও কিছু প্রক্রিয়া আছে। ভূমির মালিকানা সংবিধানে একটি মৌলিক অধিকার। বিজ্ঞিপ্ত দিয়ে এ অধিকার খর্ব করা যায়না।”

মি. হুদা বলেন, সরকার উৎপাদন বাড়াতে এটা করলে প্রশ্ন আসে অসংখ্য অনুপস্থিত মালিকের জমি গ্রামাঞ্চলে আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষিছাড়া অন্যক্সেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে কোনো বিজ্ঞপ্তি তো দেখিনি।

“এই যে কৃষিজমি অন্য খাতে চলে যাচ্ছে। ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে। অন্য অকৃষিখাতে যাচ্ছে। সেগুলো রক্ষায় কোনো উদ্যোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই। আবার সরকারের প্রচুর কৃষি খাস জমি। নীতি অনুযায়ী সেগুলো ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণও অধিকাংশ জেলায় স্থগিত আছে। চরাঞ্চলে এমন হাজার হাজার একর জমি পড়ে আছে।“

মি. হুদা বলেন, সরকারর হাতে অসংখ্য খাস জমি আছে সরকার সেগুলো অনেকদিন ধরেই কৃষিকাজের জন্য ভূমিহীনদের বরাদ্দ দেয়া বন্ধ করে রেখেছে কারণ এগুলো অন্য কাজে যেমন সরকারি প্রকল্প বা ইপিজেড এমন কাজে ব্যবহার করা হবে।

এগুলো কৃষিকাজে না এনে ব্যক্তি কৃষিজমি নেয়ার এমন বিজ্ঞপ্তি স্ববিরোধিতা বলে মনে করেন তিনি।