রক্তের স্রোতে ভাসছে রাঙামাটি, নানা রহস্য, গুজব

শক্তিমানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যাওয়ার পথে গাড়িতে গুলিতে নিহত ৫

সহিংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের জেরে রক্তের স্রোতে ভাসছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি। উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা খুন হওয়ার ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল গুলি করে পাঁচজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাহাড়ে তৈরি হয়েছে উত্তেজনা। বড় দুটি হত্যাকাণ্ডে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

বৃহস্পতিবার নিহত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে রাঙামাটিতে একটি মাইক্রোবাসে গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাঙামাটি শহর থেকে প্রায় ৫০ কি.মি দূরে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সীমান্তের কাছে বেতছড়ি এলাকায় ওই হামলায় আরও আটজন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, জনসংহতি সমিতির সহযোগী সংগঠন যুব সমিতির (এম এন লারমা) মহালছড়ি শাখার সভাপতি সুজন চাকমা এবং সদস্য তনয় চাকমা ঘটনাস্থলেই মারা যান।

মাইক্রোবাসের চালক সজীব এবং যুব সমিতির (এম এন লারমা) সদস্য রবিন চাকমা খাগড়াছড়ি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান বলে জানা গেছে। শক্তিমানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে সংগঠনের ১২ জন নেতা-কর্মী খাগড়াছড়ি থেকে ওই মাইক্রোবাসে করে রাঙামাটির নানিয়ারচরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। পথে বেতছড়ি এলাকায় তাদের গাড়িতে ‘ব্রাশফায়ার’ করা হয়। তবে রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবির বলছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আছে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার সকালে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত উপজেলা চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় যাওয়ার পথে বেতছড়ি এলাকায় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে।

এ সময় ঘটনাস্থলে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর বিদ্রোহী গ্রুপ নব্য মুকোশ বাহিনীর প্রধান ও ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক-এর আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ সংগঠনটির ১২ নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। এ ব্যাপরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত জীবন্ত চাকমা ও নীরব কুমার চাকমা নিজেদের সাধারণ গ্রামবাসী দাবি করে জানান, তারা সবাই যাচ্ছিলেন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

কিন্তু তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি খাগড়াছড়ি সীমানা অতিক্রম করে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি পৌঁছামাত্র সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। সন্ত্রাসীরা প্রথমে চালককে গুলি করলে মাইক্রোবাসটি উল্টে যায়। পরে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলে তাদের সঙ্গে থাকা তিনজন মারা যান। গুলিবিদ্ধদের খাগড়াছড়ি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মাইক্রোবাসের চালকসহ দুজন মারা যান। নিহতদের মধ্যে দুজনের মরদেহ খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ও তিনজনকে রাঙামাটির সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, খবর পেয়ে হতাহতদের উদ্ধারে তাত্ক্ষণিক পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গেছে। রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. জাহাঙ্গীর আলম ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তিনজনের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে সেতু লাল চাকমা নামে একজন ও গাড়ির চালক মো. সজীব মারা যান।

খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. নয়নময় ত্রিপুরা জানান, হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ ১০ জনকে আনা হয়েছিল তাদের মধ্যে দুজন মারা যান। আশঙ্কাজনক হওয়ায় আহতদের মধ্যে চারজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকি চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির এম এন লারমা গ্রুপ অর্থাৎ সংস্কারপন্থির কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুদর্শন চাকমা এ ঘটনার জন্য প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের প্রচার ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান নিরণ চাকমা।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার দল ও ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমা। এ ঘটনার পরপরই ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা ও নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ একই গ্রুপের চারজন নিহত হন। এ সময় আরও নিহত হন সাধারণ বাঙালি মাইক্রোবাস চালক মো. সজীব। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল লতিফ।

এদিকে ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে থাকা লিটন চাকমা বার্তা সংস্থা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করার পর তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাকে হত্যার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে একক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা (ইউপিডিএফ) একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। উল্লেখ্য, ইউপিডিএফ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা।

monitorbd