স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যুদ্ধে ‘পুলিশ পাহারায়’ মাদকের হাট

সারা দেশে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান। আলোচিত এই অভিযানের এ পর্যন্ত ২৭ দিনে কথিত বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ১৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই অভিযান সারাদেশে সমালোচনার ঢেউ তুলেছে। বিভন্ন রাজনৈতিক নেতা, বিশ্লেষকরা এই নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। বাদ যায়নি সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমও।সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মাদকের সাথে পুলিশের সম্পৃক্ততা। এ নিয়ে বিশিষ্ট জনের বিভিন্ন কথা বলেছেন। অথচ সরকার যেন বয়রা হয়ে বসে আছে! যেমন লাউ তেমন কদু।

বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, যারা এই মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছে তারাই যদি এর সাথে জড়িয়ে পড়ে তাহলে এই অভিযান আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে আগে থেকেই এমন অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এখন আবারো তাদের বিরুদ্ধে এমন সময় অভিযোগ উঠেছে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদক নির্মূল অভিযান পরিচালনা করছে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন সেখানে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা মাদক ব্যবসায়ীদের শেলটার দিচ্ছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমান তালে অভিযান চলবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। আমাদের ভবিষ্যৎ মেধাকে রক্ষা করতে মাদক দমন করতেই হবে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ-র্যাব সর্বত্র অভিযান পরিচালনা করছে এবং এটা সবসময় চলবে। আমরা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি, এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। (২০ মে, ২০১৮)

র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জাতিগত যুদ্ধ করতে হবে। ’৭১ সালের পর জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অনেক বড় বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। এবারও আশা করি এর একটা ভালো ফলাফল পাব, মানুষ বিজয়ী হবে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকের খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে ডিলার সে যেই হোক, তাকে এ পেশা ছাড়তে হবে। হু এভার, হোয়াট এভার, হয়ার এভার, কেউ আমাদের অপারেশনের বাইরে নয়। মাদকের শিকড়-বাকড়সহ তুলে নিয়ে আসব। (১৯ মে, ২০১৮)

প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডিজি ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা মাদকের বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে গেলেও পুলিশ সেই মাদক ব্যবসায়ীদের আড়াল যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন।পত্র-পত্রিকার তথ্য মতে, খোদ রাজধানীর মুগদা থানারই সাত পুলিশ কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। টাকা নিয়ে মাদক বেচাকেনার সুযোগ করে দিতেন তারা। মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগী হিসেবে কাজ করা সাত কর্মকর্তার নাম ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। ওই সাত পুলিশ কর্মকর্তাকে মুগদা থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।

দৈনিক যুগান্তরের তথ্য মতে, দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চললেও তেজগাঁও রেললাইন বস্তিতে ‘পুলিশি প্রহরায়’ মাদক ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারওয়ান বাজার, এফডিসি রেলগেট ও তেজগাঁও এলাকায় পুলিশকে সাইরেন বাজিয়ে চলতে দেখা গেছে। সাইরেনের আওয়াজ পেয়েই সতর্ক হয়ে যায় মাদক বিক্রেতারা। অভিযোগ রয়েছে- মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা পাওয়ায় পুলিশ তাদের দেখেও না দেখার ভান করছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব তথ্য। (২৪ মে, ২০১৮)

পরের দিন যুগান্তরের আরেকটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, যশোর জেলা পুলিশের অ্যাডিশনাল এসপি মো. জালাল আহম্মেদ জানান, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশের কোনো সফলতা না থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানোর অভিযোগে ওই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফিরোজ উদ্দিনকে প্রত্যাহার করে যশোর পুলিশ লাইনে স্থানান্তর করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি অপূর্ব হাসান শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় বর্তমানে তিনি ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন। (২৫ মে, ২০১৮)

ইত্তেফাক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তা মাদক নির্মুল অভিযানে যাওয়ার আগে সোর্সের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে এ তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে। এ কারণে অধিকাংশ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী গা-ঢাকা দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে তারা ধরাছোয়ার বাইরেই থাকছেন। আর যারা ধরা পড়ছে তাদের বেশিরভাগ সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতা।খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা উঠিয়ে পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তার কাছে তারা পৌঁছে দেয়। এসব মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষের টাকা পেয়ে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বড়লোক হয়েছেন, তারা এখন অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন।

তবে বড় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। নিয়মিত তারা বড় অঙ্কের টাকা পেয়ে থাকেন। যাই হোক মাদকের গডফাদাররা গ্রেফতার না হওয়ার মূলে রয়েছে অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁস হওয়া। (২৯ মে ২০১৮)যুগান্তরের তথ্য মতে, খোদ পুলিশের শেল্টারে চলছে মাদক ব্যবসা। রাজধানীর পল্লবীর একাধিক স্পটে এখনও প্রকাশ্যে চলছে মাদক ব্যবসা। কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যকে ম্যানেজ করে বিহারি অধ্যুষিত এ এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক মাদক স্পট।

এখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের মূল শেল্টারদাতা এসআই বিল্লাল হোসেইন। তাকে ম্যানেজ করতে পারলেই মাদক ব্যবসায়ীদের আর কোনো সমস্যা নেই। তিনি বিকাশের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেন। বিল্লালের সঙ্গে সখ্য রয়েছে এমন মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে পুলিশকে কোনো সোর্স তথ্য দিলে তার রেহাই নেই। বিল্লাল নিজে উদ্যোগ নিয়ে সেই সোর্সকে মাদকসহ মামলা দিয়ে জেলে পাঠান।ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এসআই বিল্লালের নাম উঠে এসেছে। উৎসঃ amadershomoy