০+০+০=শূন্য : শেখ হাসিনা

সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন সম্পন্ন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তারাই নির্বাচন করবে। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীণ সরকার হবে সংবিধান অনুযায়ীই। সংবিধানে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই ভোটের সবকিছু হবে। গতকাল গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচন উপলক্ষ্যে ১৪ দলীয় জোট ও ২০ দলীয় জোটের বাইরে আরেকটি জোট হচ্ছে; আপনার মন্তব্য কি? জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই যে একটা হিসেব আছে না; ০+০+০= শূন্য। এটাও এমন হবে। তারপরও নির্বাচন উপলক্ষ্যে জোট হলে এটা অবশ্যই ভাল। তারা যদি এক হয়ে নির্বাচন করে তাহলে যারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে, দুর্নীতির দায়ে জেলে রয়েছে মানুষ তাদের ক্ষমতায় আসতে দেবে না। প্রধানমন্ত্রীর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সফরের সফলতা জানানো উপলক্ষ্যে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা সাবেক প্রেসিডেন্ট একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ‘বদু কাকা’ সম্বোধন করে বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর বদু কাকাকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের নামে প্রহসন করেছিলেন। তিনি কি জিয়ার আমলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ৭৯ সালের নির্বাচনের কথা ভুলে গেছেন? ওই নির্বাচন ব্যবস্থা কী রকম ছিল? তখনও তো তিনি বিএনপির ওই ভোট চুরির সঙ্গী ছিলেন। এদের মুখে ভোটের কথা শুনলে, পাগলেও হাসবে। অবশ্য তাকেও বেশি দিন রাখেননি খালেদা জিয়া। বিদায় নিতে হয়েছে। এখন সব ভুলে গিয়ে তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করছেন। আসলে একটা কথা আছে না, ‘মেরেছে কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দিব না।’ দেশে নির্বাচন হবে সংবিধান অনুসারে। ভোট চোরদের কাছ থেকে শিখতে হবে না কীভাবে নির্বাচন হবে। কারণ নির্বাচনের আধুনিকায়ন করেছে আমাদের আওয়ামী লীগ সরকার। বি চৌধুরীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ভালো কথা, বি. চৌধুরী খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করছেন। কিন্তু কার কাছে মুক্তি চান? আমার কাছে মুক্তি চেয়ে লাভ কী? আমি কি তাকে কারাগারে পাঠিয়েছি? এতিমের টাকা চুরির দায়ে আদালত তাকে সাজা দিয়েছেন, সেখানে যান। আমার কাছে মুক্তি চেয়ে লাভ নেই।

সিনিয়র একজন সাংবাদিক ভারতীয় একটি পত্রিকার খবরের সূত্র ধরে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী ভারতের কাছ থেকে কোন প্রতিদান আশা করেন কিনা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন পত্রিকা এসব নিউজ করেছে তা আমি জানি না। আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারাজীবন মনে রাখবে। প্রতিদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বোমাবাজি গুলি থেকে আমরা তাদের শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে। আমি কোনও প্রতিদান চাই না। প্রতিদানের কী আছে? আর কারও কাছে পাওয়ার অভ্যাস আমার কম। দেওয়ার অভ্যাস বেশি।

প্রবীণ এক সাংবাদিকের প্রশ্ন করতে উঠে বলেন, ‘আপনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন, এখনো নোবেল শান্তি পুরস্কার আপনার অর্জন হয়নি। এটা আপনার প্রাপ্য। এজন্য অনেক প্রক্রিয়া, সেটি আমাদের এখনই অনুসরণ করা দরকার নয় কি’? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরণের প্রক্রিয়া চালানোর আমার কোনও ইচ্ছা নাই। লবিস্ট রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। সামর্থ্য থাকলেও এসব আমি সমর্থন করি না। বাংলাদেশের মানুষকে শান্তি দিতে পারলাম কিনা সেটাই বড় বিষয়। গরিব মানুষের সুদের টাকায় নোবেল পাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই।

তিস্তা পানি চুক্তির জন্য ভারতের আশ্বাসের ওপর বিশ্বাস করে বাংলাদেশ বসে নেই এমন তথ্য জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা তিস্তা ব্যারেজ করলেন কেন? জানতেন না ব্যারেজ বানালে পানির সংকট হতে পারে। এখন পানি ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে। আমি নাকি এক বালতি পানিও নিয়ে আসতে পারি নাই। এক বালতি পানি রিজভীকে পাঠিয়ে দেয়া উচিত। আমি কোনও কিছুতেই কারও ওপরই ভরসা করে চলি না। আমার দেশের পানির ব্যবস্থা কীভাবে করতে হবে সেটা আমি করে যাচ্ছি। নদী ড্রেজিং করছি। পুকুর খনন করছি। পানি যাতে ধরে রাখা যায়, সেই ব্যবস্থা করছি। তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে ভারতের আশ্বাসের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তারা কথা দিয়েছে। এজন্য অপেক্ষা করেন। আর তাদের পানি না দিলে কি আমাদের চলবে না? আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করছি। পানির সমস্যা যাতে নিজেরা সমাধান করতে পারি, সেই ব্যবস্থা করছি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার প্রতি ইংগিত করে শেখ হাসিনা বলেন, যারা মুচলেকা দেয় আমি সে দলে না। মুসলেকা দেইনি বলে সে সময় ক্ষমতায় আসতে পারিনি। ভারত আমাকে ক্ষমতায় আনবে কী আনবে না, সেটা জানি না। কিন্তু গ্যাস আমাদের। আমেরিকান কোম্পানি আমাদের গ্যাস উত্তোলন করে ভারতে বিক্রি করবে। এ নিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারকে আমি ‘না’ করে দেই। তিনি খালেদার শরণাপন্ন হন। পরে সেই গ্যাস পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ওরা বলে, আমরা নাকি এক বালতি পানিও আনতে পারিনি। অথচ গঙ্গার পানির চুক্তি আমরাই করেছি। আমি ৩০ বছরের চুক্তি করেছি।

মাদকের সঙ্গে যারা জড়িত তারা যত বড় গডফাদার হোক আর মাফিয়া ডন হোক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তিনি গডফাদার হোক, তিনি যে বাহিনীরই হোক, এটা আমরা দেখছি না। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমি যখন যা ধরি, ভালো করেই ধরি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময়ও অনেকে সমালোচনা করেছিল। সমালোচনার ভয়ে সে অভিযান বন্ধ হয়নি; মাদকবিরোধী অভিযানও বন্ধ হবে না। মাদক সমাজের জন্য একটা ব্যাধির মতো মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর বিরুদ্ধে আপনারা পত্রপত্রিকায় লিখেছেন। আপনারা কি চান, অভিযান চলুক নাকি বন্ধ হয়ে যাক? খুব স্বাভাবিক যে, এই ধরণের অভিযান চালাতে গেলে কিছু ঘটনা ঘটবেই। এ পর্যন্ত যে কয়টা ঘটনা হয়েছে, মনে হয় না একটাও নিরীহ ব্যক্তি শিকার হয়েছে। সমাজ থেকে মাদক দূর করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি বলেন, যখন পুলিশ-র‌্যাব একটা অভিযানে যায়, তখন তাদের একটা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আর সে ঘটনায় যদি কোনও কিছু ঘটেই থাকে, আর সেখানে যদি অন্যায়ভাবে কিছু ঘটে থাকে, তাহলে তাদের কিন্তু বিচার হয়। এসব অভিযানে কোনও নিরীহ ব্যক্তি হয়রানীর শিকার হলে আমরা ব্যবস্থা নেবো। কিন্তু সমাজ থেকে মাদক দূর করতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যু ও তিস্তা পানি চুক্তি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিস্তা-রোহিঙ্গা সব কিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এবার আমি গিয়েছি বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করতে। তাই সেটিকেই জোর দিয়েছি। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের আশ্বাস দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য যথেষ্ট রিলিফ পাঠিয়েছে ভারত।

লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, তাঁর সা¤প্রতিক ভারত সফরের মধ্যদিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়েছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি এই সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে। সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক হয়। এ সময় উভয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনসহ স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে স্থাপিত বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন। একইসঙ্গে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান আসানসোলে অবস্থিত ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’ জাতীয় কবির ১১৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তনে তাঁকে ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে ‘সোনালী অধ্যায়’ অতিক্রম করছে। তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনেতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

উৎসঃ ইনকিলাব