বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানপন্থীরা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি পাকিস্তানের বলয়ও উপেক্ষা করার নয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করেই জাতির পিতার নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। জাতির পিতা স্বাধীন দেশে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি বন্ধ হয়নি। বরং খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী পাকিস্তানপন্থী ধারা বজায় ছিল।

এই ধারার ষড়যন্ত্রেই ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারের হত্যা করা হয়। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে পাকিস্তানপন্থীদের কর্তৃত্বে এবং নেতৃত্বে।মোশতাকের পর পাকিস্তানপন্থীদের মূল নেতা ছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি পাকিস্তানে বিশ্বাসী শাহ আজিজুর রহমান, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান, জেনারেল (অব.) সাজেদুল হককে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত করেন। পাকিস্তান পুনঃ:প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের নেতা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন।

পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী জামাতকে রাজনীতি করার সুযোগ দেন। ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘ বিরোধী জিয়া বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ব্যবহার উপযোগী বানান। জিয়ার মৃত্যুর পর এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। এরশাদ নিজে পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনা অফিসার হলেও ছিলেন ভারত ঘেঁষা। কিন্তু এরশাদও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো চরম পাকিস্তানপন্থীদের দলে ভেড়ান। ৯১ সালে বেগম জিয়া ক্ষমতায় আসার পর আবার পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির রক্তসঞ্চালন বেড়ে যায়। জামাতের রাজনীতি পায় পৃষ্ঠপোষকতা।

৭১ এর রাজাকার আবদুর রহমান বিশ্বাসকে করা হয় রাষ্ট্রপতি। বেগম জিয়া পাকিস্তানপন্থী নীতি গ্রহণ করেন। তবে এসময় তিনি তরিকুল ইসলাম, গয়েশ্বর চন্দ রায়ের মতো ভারত ঘেঁষাদেরও দলে প্রশ্রয় দেন। এখান থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত- পাকিস্তান দ্বৈরথ শুরু হয়। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানপন্থীদের প্রভাব সরকারে কমে, কিন্তু দেশের রাজনীতিতে পাকিস্থানপন্থীদের শেকড় গভীর হতে থাকে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা পাকিস্তানপন্থী এমন অভিযোগ সে সময় উঠেছিল।

২০০১ সালে বিএনপি- জামাত জোট ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ যেন অর্ধেক পাকিস্তান হয়ে যায়। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদের মতো যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের মন্ত্রী হন। ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাকিস্তানি মদদ দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হয় করিডোর হিসেবে। দশ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশে প্রকাশ্যে তৎপরতা চালায়। এসময় আইএসআইয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান তারেক জিয়া। পাকিস্তানি এই গোয়েন্দা সংস্থাটির সাবেক প্রধান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ২০০১ এর নির্বাচনে আইএসআই বিএনপিকে টাকা দিয়েছিল।

তারেক জিয়া ২০০৪ সাল থেকে থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থীদের প্রধান নেতা। গত ১০ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানপন্থীরা কোণঠাসা। তবে তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচনে পরাজিত একজন নেতার সঙ্গেও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানের আগ্রহ মূলত: ভারত বিরোধিতার জন্য। বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে পাকিস্তান ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার কাজে ব্যবহার করতে চায়। এজন্যই নির্বাচন এলেই পাকিস্তান তৎপর হয়। পাকিস্তানপন্থীরা তৎপর হয়। এখন পাকিস্তানপন্থীদের দুঃসময় চলছে, এজন্যই এবার নির্বাচনে তারা মরণ কামড় দিতে পারে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। -বাংলা ইনসাইডার