কোরআন এক ধর্মও এক রাজনীতি কেন ভিন্ন

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান: ইসলামে রাজনীতি আছে কি নাই এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামিক স্কলারদের মাঝেই বিতর্ক আছে। তবে সত্য হচ্ছে যারা ইসলামে রাজনীতিকে অস্বীকার করেন তাদের এক্ষেত্রে বিশেষ ব্যাখ্যা আছে। তারা সমসাময়িক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অপছন্দ করেন, একারণে চলমান পদ্ধতির বিশেষ রাজনীতিকে অস্বীকার করতে চান। তা না হলে ইসলাম এক সামগ্রিক ধর্ম, জীবনের প্রতিটি বিষয়ে এখানে রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা।

রাসুল সা. নিজে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, তারপর তার খলিফারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। প্রায় ১৩শ বছর ধরে মুসলিম শাসকরা বিভিন্ন দেশ শাসন করেছে। অটোমান সাম্রাজ্য শেষ হবার পর মুসলিম বিশ্বে যখন গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূচনা হলো তখন থেকেই এই বিতর্কের সূচনা। গণতান্ত্রিক রাজনীতি ইসলাম সমর্থন করে কি না এটা নিয়েই মূলত আলেমদের মাঝে দ্বন্দ্ব।

অনেকে গণতন্ত্রকে আলাদা ধর্ম মনে করেন। পৃথক ধর্ম মনে করার কারণে গণতন্ত্রের প্রতি রয়েছে তাদের চরম বিরূপ ভাব। বর্তমান রাজনীতি যেহেতু গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই করতে হয় এজন্য সরাসরি রাজনীতিকেই তারা হারাম ঘোষণা করেন। এই সংখ্যাটা খুব সামান্য, সামান্য হলেও এদের দিয়ে যে কোনো সময় বিশৃংখলা ঘটানো সম্ভব। আপাতত এই শ্রেণির কথা থাক। কথা হচ্ছে, যারা গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে স্বীকার করছেন তাদের ভেতরই অসংখ্য দল উপদল তৈরি হয়ে আছে।

বাংলাদেশে সম্ভবত এই দলাদলিটা একটু বেশিই। পঞ্চাশের অধিক ইসলামি দল তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর। স্বাধীনতার আগ থেকে রাজনীতি করে এমন দলও আছে চার পাঁচটি। কথা হচ্ছে ইসলামের নামে রাজনীতি করলে এই সব দলাদলি কেন? ইসলামের রাসুল এক, কুরআন এক সব কিছুই এক হওয়া সত্ত্বেও এত এত দল কেন হচ্ছে? এর উত্তর খুবই স্পষ্ট, ইসলামের বিভিন্ন শাখাকে গুরুত্ব দিয়ে একেকটি দল গড়ে উঠেছে। কেউ যিকিরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, কেউ দরুদকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, কেউ তাওহিদ ও আকিদা, কেউ সুন্নাত, ইশকে রাসুল, কেউ ইসলামি শিক্ষা, কেউ সুফিবাদকে প্রাধান্য দিয়ে দল করেছেন। এভাবে দেখা যাচ্ছে, ইসলামি দলগুলো বিভিন্ন ফেরকায় রূপান্তরিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা তাদের ধর্মে বিভক্তি সৃষ্টি করে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যায় তাদের সাথে হে মুহাম্মাদ সা. আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। [সুরা আনআম, আয়াত: ১৫৯]

গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারণাটি একেবারেই নতুন। যার ফলে এর প্রতি ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ এক জটিল বিষয়। অনেকে এজন্য আধুনিক সময়ের রাজনীতিকে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে শ্বাশত ইসলামের মাঝে বিকৃতি ঘটানোর দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর সেই চেষ্টা বোদ্ধা মহলে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেনি। ইসলামকে ইসলামের জায়গায় রেখেই মূলত আমাদের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে হবে। আজকাল অনেকেই সিস্টেমকে ইসলামাইজড করার নামে ইসলামকে সিস্টেমাইজ করে ফেলছেন। দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজের পরিবর্তন করতে হবে, সেটা না করে যদি সমাজের সব অসঙ্গতির রঙে ইসলামকে রাঙানোর অপচেষ্টা করা হয় তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ ইসলাম এক বিশ্বধর্ম, এখানে এমন কোনো ব্যাখ্যা করা যাবে না, যা কেবল এক অঞ্চলের বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাথেই খাপ খায়। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়ে এজন্য সীমাবদ্ধ বা সংকীর্ণ করা যাবে না ইসলামকে। এই একশ বছরে যারাই এমন অপচেষ্টা করেছেন তারা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছেন।

আমাদের দেশের ইসলামি রাজনীতির একটা বড় সংকট হচ্ছে মূল ধারার বৃহত্তর রাজনৈতিক দলসমূহের মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া। তাদেরকে ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক ট্যাগ দেয়া। বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে সরাসরি ইসলাম বিরোধী বলার সুযোগ নেই। সেখানে সব ধর্মের মানুষ আছে। ভালো মন্দ সব ধরনের মুসলিম আছে, কাজেই কেউ আওয়ামী লীগ বা বিএনপি করলেই জাহান্নামে যাবে বা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে এধরনের বক্তব্য আমাদের সমাজ গ্রহণ করে না। আলেম সমাজের প্রতি যত শ্রদ্ধাই থাক, এক্সট্রিম চিন্তা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করতে চায় না। বক্তব্য বিবৃতি দেয়ার সময় সতর্ক হতে হবে ইসলামি নেতাদের। ইসলামের নামে যারা রাজনীতি করেন তারা অধিকাংশ সময় এই ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেন না।

ইসলামি রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের দেশের আরেক বড় সমস্যা হচ্ছে, বাস্তব জীবনের সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা। রাজনীতি যখন করবেন তখন গণমানুষের আটপৌরে জীবনের সুখ-দুঃখ সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কাজ করতে হবে। ইসলামি দলগুলোর কর্মসূচিসমূহের শতকরা ৯৫ ভাগ দখল করে থাকে ধর্মীয় ইস্যু। ধর্মীয় বিষয় নিয়েই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে থাকেন। একটা লোক যদি বলে, ভাই আমি নামাজ পড়ি, দাড়ি রাখি, গিরার ওপর কাপড় পরি বিধায় আমাকে ভোট দেন, এটা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করবে না। মূলত নিজেদের ধার্মিকতার দোহাই দিয়ে ভোট পাওয়া সহজ নয়। এটা সুন্দরও দেখায় না। ধার্মিকতা দাবি করার বিষয় নয়, কে কতটুকু ধার্মিক তা সাধারণ জনগণ দেখবে। এর পাবলিসিটি করার প্রয়োজন নেই। জীবনের চলমান সংকটগুলো নিরসনের জন্য ইসলামি দলগুলোর পদক্ষেপ থাকতে হবে এবং পারস্পরিক সংঘাত থেকে বিরত থাকতে হবে তাহলেই সাধারণ মানুষ সেদিকে আকৃষ্ট হবে।

ইসলামি রাজনীতির আলোচনায় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে পৃথক ইসলামি দল সৃষ্টি না করে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোতেও কাজ করা যায়। মূল ধারার প্রতিটি দলেই প্রভাব সৃষ্টি করা যায় কোনো দলে না থেকেও। এক দল আলেম এজন্য বলেন, বতমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতি ত্যাগ করাও বড় রাজনীতি। রাজনীতির এই সব ধরনই অনুসৃত হতে পারে। আমাদের দেশে বিভিন্ন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষাই ইসলামপন্থিরা করেন। যে যেই মত অনুসরণ করেন সেই মতের প্রতি তার আস্থা থাকা স্বাভাবিক, তবে অন্য মতগুলোর প্রতিও যেন আমরা শ্রদ্ধাশীল হতে পারি সেই চেষ্টা করতে হবে। মতানৈক্য সত্ত্বেও বৃহত্তর ঐক্যের চিন্তা করতে হবে আমাদের। এককথায় বিভক্তি নয় ঐক্যচিন্তাই হোক ইসলামি রাজনীতি চর্চায় আমাদের ভবিষ্যৎ রণ কৌশল।

উৎসঃ সময়টিভি