বিএনপিতে কাটছে না গ্রেফতার আতঙ্ক

বিএনপিতে কাটছে না গ্রেফতার আতঙ্ক। গণগ্রেফতার বন্ধ হলেও প্রতিদিনই নেতাকর্মীদের আটক করা হচ্ছে বলে দাবি দলটির। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সক্রিয়দের টার্গেট করে চালানো হচ্ছে এ অভিযান।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতারের পর কেউ স্বস্তিতে নেই। গ্রেফতার এড়াতে কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বেশির ভাগ শীর্ষ নেতা রয়েছেন আত্মগোপনে। গ্রেফতারের ভয়ে অনেকেই নিজ বাসায় রাতযাপন করছেন না।

প্রয়োজন ছাড়া কেউ আসছেন না প্রকাশ্যে। কৌশলে করছেন চলাফেরা। ২৪ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো যুগপৎ আন্দোলনে নামছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। ওইদিন রাজধানী ছাড়া সারা দেশে পালিত হবে গণমিছিল। ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় হবে এ কর্মসূচি।

যুগপৎ আন্দোলন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। দলটির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ৮ ডিসেম্বরের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে দেড় হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিএনপির অভিযোগ, সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় মধ্যম সারির নেতা ও কর্মীদের সংগঠিত করতে পারেন-এমন নেতাদের বেছে বেছে গ্রেফতারের টার্গেট করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে মামলা। ইতোমধ্যে থানাওয়ারি এসব নেতাকর্মীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেটা ধরেই চলছে অভিযান। তবে পুলিশ বলছে, বিএনপি নেতাদের টার্গেট করে গ্রেফতারের বিষয়টি সঠিক নয়।

জানতে চাইলে বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাজাহান যুগান্তরকে বলেন, ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ কেন্দ্র করে সারা দেশে গণগ্রেফতার চালানো হয়। ওইসময় গ্রেফতার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিএনপি নেতাকর্মী। ঢাকার সমাবেশের পর নেতাকর্মীদের আটক কিছুটা কমেছিল; কিন্তু কমেনি আতঙ্ক। গণমিছিলকে কেন্দ্র করে সেটা ফের বাড়ছে। গণমিছিল কর্মসূচি যাতে পালন না হয়, সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গ্রেফতার বা চাপ যাই আসুক, আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করবই।

নেতাকর্মীদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) একেএম হাফিজ আক্তার যুগান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অহেতুক কোথাও অভিযান হচ্ছে না। বিএনপির পরবর্তী কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কিছু হচ্ছে না। এরপরও যেহেতু কথা এসেছে, বিষয়টি আমাকে দেখতে হবে।

ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে পুলিশ ও বিএনপি মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে একজন নিহত এবং পুলিশসহ আহত হন শতাধিক নেতাকর্মী। ওইদিন কার্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে অভিযান চালিয়ে বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবির রিজভী, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, খায়রুল কবির খোকন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আব্দুস সালামসহ চার শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। পরে তাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

পরদিন ৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে বাসা থেকে আটক করা হয় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে।

দলের মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতারের পর সবার মধ্যেই একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যে কাউকে আটক করা হতে পারে-এমন শঙ্কা থেকে সবাই সতর্ক চলাফেরা করছেন। পুলিশি হামলার চার দিন পর ১১ ডিসেম্বর খোলা হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। কিন্তু কার্যালয় খোলার পর আগের মতো নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না।

কেন্দ্রীয়, মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাই গ্রেফতার ভয়ে কার্যালয়ে আসছেন না। দলীয় কর্মসূচি থাকলেও অনেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তাতে অংশ নিয়ে দ্রুতই সেখান থেকে সরে পড়ছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসিফুর রহমান বিপ্লব যুগান্তরকে বলেন, ১ ডিসেম্বর থেকে গণগ্রেফতার শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেদিন থেকে এখন পর্যন্ত বাসায় রাতযাপন করতে পারছি না। প্রতিদিনই বাসার আশপাশে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন ঘোরাফেরা করছে। পুলিশ নিয়মিতই বাসায় যাচ্ছে।

জানা যায়, ১৮ ডিসেম্বর ভোরে ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ১৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. হান্নান ভুইয়া, উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৫০নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. শাহজালাল ও তার ছেলে ছাত্রদল নেতা শেখ রাসেলকে আটক করে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে শাহআলী থানাধীন ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি জয়নাল মহসিন, যুগ্মসম্পাদক আতাউর, ডা. ফয়েজ, কোষাধ্যক্ষ সাইফুল মালিক, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক আব্দুল আজিজ, স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মাবেল ভুইয়া ও সদস্য মো. ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বংশাল থানাধীন ৩৩নং ওয়ার্ড বিএন?পির সভাপতি আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার পুরান ঢাকার সাত রওজা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশের পরদিন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করে পুলিশ। সেই মামলায় তাকে গ্রেফতার করতে সম্প্রতি তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। তাকে না পেয়ে পুলিশ তার ও তার মায়ের কক্ষ ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ বিএনপির।

জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স যুগান্তরকে বলেন, সরকারের অপশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশের জনগণ জেগে উঠেছে। বিএনপির প্রতিটি সমাবেশে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাড়ছে। এসব দেখে সরকারের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তাই বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার মিশন নিয়ে নেমেছে সরকার। এর অংশ হিসাবে শুরু করেছে গ্রেফতার অভিযান। সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে কেউ বাদ যাচ্ছে না। প্রতিদিন নেতাকর্মীদের বাসায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কেউ বাসায় ঘুমাতে পারছে না।

তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের গ্রেফতার চলমান ভয়াবহ দুঃশাসনকে দীর্ঘায়িত করার অপচেষ্টামাত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী নেতাকর্মীদের পরিকল্পিতভাবে গ্রেফতার-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে অবৈধ সরকার বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। নিপীড়ক সরকার মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে কারাগার পূর্ণ করে ফেলেছে। বর্তমানে কারাগারগুলোয় কোনো ঠাঁই নেই। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকায় বর্তমানে কারাগারে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও চলছে গ্রেফতার। মঙ্গলবার টাঙ্গাইলে বিএনপি নেতা শহীদ রফিকুল ইসলাম ফারুকের স্মরণসভা থেকে টাঙ্গাইল পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মারুফ সরোয়ার, টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিব হোসেন, টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রদলের সদস্য তৌফিকুর রহমান মাহিদ, বাঘিল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সরোয়ার হোসেন, বাঘিল ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আশরাফ, ওমর আলী, ডা. বেলায়েত হোসেন, কাতুলী ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি লুৎফর রহমানসহ আরও কয়েক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

শুক্রবার কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার পথে বিএনপির ৮ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আবজাল হোসেন, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল আহমেদ, ছাত্রদলের কর্মী শহিদুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আকাশ হোসেন, যুবদল কর্মী ইমরান হোসেন, জুবায়ের হোসেন ও শাহিন আহমেদ।

এ প্রসঙ্গে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বলেন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেফতার চলছেই। বিএনপি নেতাকর্মীরা যখন মাঠে নামছে, তখনই মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে সরকার। গায়েবি মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।

১৩ ডিসেম্বর গ্রেফতার করা হয়েছে মাগুরা জেলা বিএনপির আলী আহমেদ ও সদস্য সচিব আকতার হোসেনকে। ১৪ ডিসেম্বর আটক করা হয় ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলীকে। তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাইল মিয়া ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক সাইদুর রহমানকে আটক করেছে পুলিশ। ১৩ ডিসেম্বর শহরের রথখোলা এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর খুলনার তেরখাদা উপজেলা বিএনপির সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিক চৌধুরী কওসার আলী ও সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিবসহ ৮ নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে যশোর জেলা বিএনপির নেতা ও চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খানসহ দুজনকে।