সরকার পতনের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতার ভাই

রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন পটুয়াখালী জেলা যুবদলের সভাপতি মনিরুল ইসলাম লিটন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের মামলায় এখন জেলহাজতে আছেন তিনি। রোববার তার জামিনের জন্য আবেদন জানানো হলে তা নামঞ্জুর করেন আদালত। পটুয়াখালীর এই যুবদল নেতার গ্রেফতার হওয়া নিয়ে তোলপাড় চলছে বরগুনার আমতলী উপজেলায়। কেননা লিটনের বড় ভাই গোলাম সরোয়ার ফোরকান এখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রার্থী। স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতাও তিনি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলছেন, ‘শুধু এক ভাই যে যুবদল করে তা নয়, ফোরকানের বাবাও ছিলেন বিএনপির পদধারী নেতা। তাছাড়া রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরোটা সময় নৌকার বিরোধিতা করে এসেছেন এই গোলাম সরোয়ার ফোরকান। তিনি নিজেও একসময় বিএনপি করতেন।’ ফোরকান অবশ্য এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি। যুবদল নেতা ভাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা সম্পর্ক নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘সে তারটা খায় আর আমি আমারটা। তাছাড়া আমাদের দুজনার নির্বাচনি এলাকাও এক নয়। সে পটুয়াখালীর, আমি বরগুনা। আজন্ম আওয়ামী লীগ করে এসেছি। এখনো করছি। এসবই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার।’

বুধবার রাজধানীর পল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের সময় যুবদল নেতা লিটনের গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পটুয়াখালী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘ঢাকা সমাবেশে যোগ দিতে পটুয়াখালী থেকে যুবদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন মনিরুল ইসলাম লিটন। বুধবার বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের হামলা-গুলির আগে পল্টন অফিসের সামনে সমাবেশে যোগ দেন তিনি। পরে পুুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তার জামিনের জন্য রোববারও আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু তা নামঞ্জুর হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট মজিবর বলেন, ‘তার (লিটন) ভাই যে বরগুনার একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা, সেটা আমরাও জানি। একসময় তিনিও (ফোরকান) পটুয়াখালীতে থাকতেন। পরে আমতলীতে স্থায়ী হন। তবে লিটনের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির একজন একনিষ্ঠ কর্মী সে। একসময় পটুয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ছিল। বর্তমানে প্রায় ৩ বছর ধরে পালন করছে জেলা যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব। এর আগেও আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে মামলা-হামলায় জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে লিটন।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে পল্টনে লিটনের গ্রেফতারের খবর ছড়ায় বরগুনার আমতলীতে। এর পরপরই সেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান খান বাদল বলেন, ‘ওনার (গোলাম সরোয়ার ফোরকান) বাবা মরহুম কাঞ্চন মিয়াও ছিলেন পটুয়াখালী বিএনপির একজন নেতা। আমতলীতে বসে ফোরকান যখন আওয়ামী লীগের পক্ষে বলেন, তখন তার ভাইয়েরা সরকার পতনের আন্দোলনে গিয়ে গ্রেফতার হয়। তিনিও (ফোরকান) তো একসময় বিএনপি করতেন। এখন আওয়ামী লীগ হয়েছেন। এটা অবশ্য একটা ভালো পদ্ধতি। একেক ভাইকে একেক দলে রাখা। এতে করে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সব সময় সুবিধা নেওয়া যায়।’ গুলিশাখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবাহান লিটন বলেন, ‘সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে ফোরকান সাহেব চেয়ারম্যান হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে। নৌকার বিরুদ্ধে আনারস প্রতীকে নির্বাচন করেন তিনি। পরে অবশ্য ঋণখেলাপির তথ্য গোপনের দায়ে চেয়ারম্যান পদ থেকে বরখাস্ত হন। তার আপন ভাই রফিকুল ইসলাম রিপন গুলিশাখালী ইউনিয়নে নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেছেন। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে নৌকার বিরুদ্ধে যারা এখানে প্রার্থী হয়েছেন, তাদের সরাসরি সমর্থন দিয়েছেন ফোরকান। যার বহু প্রমাণ রয়েছে। এখন তার ভাই সরকার পতনের আন্দোলনে গিয়ে পল্টনে গ্রেফতার হলো। আমি মনে করি, নিজেকে আওয়ামী লীগ বলার অধিকার হারিয়েছেন তিনি।’ হলদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক যুগ্মসাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গোলাম সরোয়ার ফোরকানের পুরো পরিবার আওয়ামীবিরোধী। এসব ঘটনা তো সবার জানা।’

পটুয়াখালী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ চুন্নু মিয়া বলেন, ‘এসব তো বহু আগের ঘটনা, তবে যতদূর মনে পড়ে ফোরকানের বাবা মরহুম কাঞ্চন মিয়া জাগো দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। পরে যখন বিএনপির প্রথম কমিটি হয় পটুয়াখালীতে, সেই কমিটিতেও তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল পদে। তাছাড়া দল পরিচালনা প্রশ্নে তখন কাঞ্চন মিয়াকে আমরা জানতাম ডোনার হিসাবে। দলের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন প্রশ্নে আর্র্থিক সহযোগিতা করতেন তিনি।’ পটুয়াখালী জেলা বিএনপির আরেক নেতা বলেন, ‘কাঞ্চন মিয়া পটুয়াখালী জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালে কোষাধ্যক্ষ পদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া আমৃত্যু তাকে জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গেই দেখেছি।’

গোলাম সরোয়ার ফোরকান বলেন, ‘আমার কোন ভাই কী করল, তার দায়দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে কেন? বরং যারা এসব বলছে তাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁজে দেখুন। দেখবেন যে তারাই নব্য আওয়ামী লীগার। স্বীকার করছি যে লিটন আমার ভাই। কিন্তু তাই বলে তার অপকর্মের দায় তো আমি নেব না। তাছাড়া সে যুবদল করে পটুয়াখালীতে আর আমি আওয়ামী লীগ করি বরগুনায়। আমাদের দুজনকে কেন মেলাচ্ছেন? আমি কি তারটা খাই না পড়ি? আমার বাবা বিএনপি করতেন, এটা আমি জানি না। অথচ যারা এসব মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা জানে। বিষয়টা হাস্যকর নয়? আমার আরও দুই ভাই তো আওয়ামী লীগ করে। তাদের ব্যাপারে তো কেউ কিছু বলছে না। এখানে (আমতলী) দলের সভাপতি পদে আমাকে নির্বাচন করেছে কেন্দ্র। এই নিয়ে যাদের গাত্রদাহ আছে তারাই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব অভিযোগের একটিও সত্য নয়।’