সিলেটে লাখো মানুষ অনাহারে দিন কাটছে : খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি

পাঁচদিন ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে সিলেটের বন্যাদুর্গত লাখো মানুষ। আকস্মিক বন্যার তোড়ে ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ায় শূন্য হাতে অনেকে উঠেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। তাদের নেই খাবার। কাপড়। বিশুদ্ধ পানি। আসছে না পর্যাপ্ত ত্রাণ। সরকারি ত্রাণের দেখা মিলছে না অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে। বেসরকারি উদ্যোগে কিছু ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। এতে কেউ একবেলা খাবার পাচ্ছেন আবার কেউ পাচ্ছেন না। বয়স্ক ও শিশুদের খাবার ও ওষুধ কিনতে পারছেন না বানভাসী মানুষ।

এতে এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ত্রাণ নিয়ে কোনো কেন্দ্রে কেউ এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছেন অভুক্ত মানুষ। শুরু হয়ে যায় কাড়াকাড়ি। সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চলছে উদ্ধার তৎপরতা। নতুন করে পানি না বাড়লেও কমছে না খুব একটা। এতে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এমন অবস্থায় খাদ্য এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জে অবর্ণনীয় পরিস্থিতি: পঞ্চাশ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম সাত সন্তানের জননী। বছর কয়েক আগে স্বামী মারা গেছেন। নিজের ভিটে মাটি বলতে কিছুই নেই। কোম্পানীগঞ্জের তেলিখাল ইউনিয়নের তেলিখাল গ্রামের মানুষের বাড়িতে খুপরি ঘর বানিয়ে ছোট ছোট শিশু সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। পরিবারের আয়ের একমাত্র সম্বল ছিল ছোট একটি নৌকা। তার স্বামী এই নৌকা দিয়ে যে আয় করতেন সেটা দিয়েই ৯ সদস্যের সংসার চলতো। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর ৭ সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন আনোয়ারা।

বাধ্য হয়ে স্কুলপড়ুয়া সন্তানেরা নৌকা চালাতেন। কিন্তু আনোয়ারাদের সেই খুপরি ঘর আর নৌকা বানের জলে ভেসে গেছে। পানিতে ভাসতে ভাসতে সাত সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তেলিখাল উচ্চ বিদ্যালয়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে আসার পর একদিকে আনোয়ারাদের খাবারের কষ্ট। আর অন্যদিকে উপার্জন করার নৌকা হারানোর বেদনা।

আনোয়ারা বলেন, এখন আমি কোথায় যাবো? কই থাকবো? সন্তানদের মুখে কীভাবে খাবার তুলে দিবো? এক সপ্তাহ ধরে মুড়ি-চিঁড়া খেয়ে আছি। সন্তানেরা ভাত খেতে চায়। চাল, ডাল, হাঁড়ি পাতিল, চুলা কিছুই নেই। মানুষ চিঁড়া-মুড়ি দেয় সেটা দিয়ে ৮ জন মিলে একবেলা খেয়ে আরেকবেলা না খেয়ে থাকি।

শুধু আনোয়ারা নয়, তার মতো কোম্পানীগঞ্জের আরও কয়েক হাজার পরিবার সর্বনাশা বন্যায় নিঃস্ব হয়েছেন। গতকাল সরজমিন কোম্পানীগঞ্জে বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চল ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র দেখা গেছে।

উপজেলার গ্রামের পর গ্রাম, ইউনিয়নের পর ইউনিয়ন পানির নিচে। পাকা, আধাপাকা, মাটির ঘর সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে মাটির ঘর পানির ঢলে ভেসে গেছে। এসব ঘরের বাসিন্দারা কিছুই উদ্ধার করতে পারেননি। শুধু প্রাণ নিয়ে এক কাপড়ে আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। নিজের শেষ সম্বল রক্ষার্থে অনেকে ঝুঁকি নিয়ে তার ঘরেই অবস্থান করছেন। বন্যার কারণে শত শত বাড়ি, গাছপালা পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সোমবার ট্রলার নিয়ে যাত্রা শুরু করে দেখা যায় হাজার হাজার হেক্টর জমিতে থৈ থৈ করছে পানি।

এখনও অনেক বাড়ির টিনের চাল পর্যন্ত পানি। মাঠঘাটে গাছের উপরের ডালপালা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। নিচু কিছু এলাকায় বিদ্যুতের তার সমান পানি। দোতলা বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। আবার বাঁচার জন্য অনেকে ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। শত শত গরু ছাগল পানিতে হারিয়েছে। খাদ্যর অভাবে আর পানিতে থাকতে থাকতে অনেক গরু মারা যাচ্ছে।

গত কয়েকদিন ধরে অনেক এলাকার পানিবন্দিরা এখনও ত্রাণের দেখা পাননি। বিশেষ করে যারা তাদের ঘর ছাড়েননি। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়াতে এবং পর্যাপ্ত নৌকা না থাকার কারণে তাদের কাছে কেউ চাল-ডালতো দূরের কথা একটু চিঁড়া মুড়ি নিয়ে আসেনি। ঘনবসতি এলাকায় বিভিন্ন সংস্থা ও দলের পক্ষ থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট, একপোয়া চিঁড়া বা মুড়ি ও ২ লিটার খাবার পানি দেওয়া হয়েছে গত এক সপ্তাহে ২/১ বার। কিন্তু যাদের পরিবারে পাঁচ থেকে সাতজন বা তার চেয়ে বেশি সদস্য তাদের জন্য এসব খাবার দিয়ে একবেলাও চলে না।

তেলিখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেলিখাল উচ্চ বিদ্যালয়, কবির শাহ্ কমিউনিটি সেন্টার ও দারুসসুন্নাহ্ মোহাম্মদীয়া মাদ্রাসার আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার কমবেশি পাঁচ শতাধিক পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। শিশুসন্তান থেকে শুরু করে আশি বছর বয়সী ব্যক্তি সেখানে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ।

ফরিদুর রহমান বলেন, স্ত্রী, সন্তান, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনীসহ ৮ জন এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। সেনাবাহিনীসহ আরও কিছু মানুষ মুড়ি, চিঁড়া, বিস্কুট ও খাবার পানি দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো দিয়ে একবেলাও চলে না। তিনি বলেন, একদিকে বন্যায় বাড়ি-ঘরের সব হারালাম আর এখন না খেয়ে মরতেছি। পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেয়া রইস উদ্দিন বলেন, বিশুদ্ধ পানির অভাবে বন্যার নোংরা পানি খেয়ে ছোট বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। খাবারের তীব্র সংকট। এছাড়া রাত হলে অন্ধকারে থাকতে হয়।

শিমুলতলা গ্রামের রেহেনা বেগম বলেন, তিনি নিজে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। কিছুদিন আগে স্বামীও মারা গেছেন। বন্যার পানিতে বাড়ি ঘর নষ্ট হয়েছে। ছোট ছেলেকে নিয়ে তিনি দিশাহারা। এক সপ্তাহ ধরে ভাত না খেয়ে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। শিমুলতলা গ্রামের আরেক বাসিন্দা সফর উদ্দিন তার বাড়িতে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে চুলা ধরানো যাচ্ছে না। ঘরের ভেতর ৫ ফুট পানি ছিল। এখন কিছুটা কমেছে। সাতজনের সংসার না খেয়েই দিন পার করছি। কেউ সাহায্য নিয়ে আসে না।

বন্যায় বাড়ি-ঘর ভেঙে যাওয়ায় ৬ ছেলে মেয়েকে নিয়ে বড় নৌকায় আশ্রয় নিয়েছেন রত্না বেগম ও সিব্বির আহমেদ। অন্যর নৌকা। প্রতিদিনই তাগাদা দেয় নৌকা নিয়ে যাবে। রত্না বেগম বলেন, হাতে পায়ে ধরে নৌকাটা আটকে রেখেছি। যদি নিয়ে যায় তবে এই শিশু বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়ার মতো স্থান নাই। এমনিতেই কিছু খেতে পারছি না। না খেয়ে দিন পার করছি। যা ব্যবস্থা করি তা সন্তানদের মুখে দেই। তার উপর থাকার সমস্যা।

শিমুলতলা গ্রামের আসফাক উদ্দিন বলেন, ছোট্ট একটু জায়গায় আমরা ১৮টি পরিবারের ৬০ জন বাস করি। সবাই না খেয়ে আছি। আমাদের ঘরে এখনও কয়েকফুট পানি। ঘর দরজা ঠিক করবো না খাবারের ব্যবস্থা করবো বুঝে উঠতে পারছি না। আমাদের বাড়িতে কেউ কোনো ত্রাণ নিয়ে আসেনি। আমরা একটু চিঁড়া-মুড়িও পাইনি।

লামা ডিসকি এলাকার বাসিন্দা ওয়াজিবুন বেগম বলেন, আমাদের বাড়িতে সাত পরিবারের ৫৩ জন বাস করেন। বন্যায় আমাদের সবার ঘর ভেঙেছে। গায়ের কাপড় ছাড়া আর কিছু রাখতে পারিনি। ধান, চাল, কাপড়-চোপড়, হাঁড়ি-পাতিল, লেপ-তোষক সব চলে গেছে। আমাদেরকে কেউ কিছু দেয়নি। মুকিত মিয়া নামের আরেকজন বলেন, আমাদের বাড়ির চারপাশে ১০ থেকে ১২ ফুট পানি। এতদিন ছিলাম আরেক বাড়ির ছাদে। এখন কিছুটা পানি কমায় বাড়ি ঘর দেখতে এসেছি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শুধু সামান্য চিঁড়া খেয়ে দিন পার করছি।

এদিকে, কোম্পানীগঞ্জের পানিবন্দি এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধার ও শুকনা খাবার এবং পানি সংগ্রহের কাজ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। স্পিডবোট দিয়ে তারা দূর-দূরান্তের গ্রামে পৌঁছে বন্যাদুর্গতের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া বিজিবিসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থা, ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে সাহায্য করা হচ্ছে।

খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই: চারদিন অসুস্থ কোম্পানীগঞ্জের চানপুরের বৃদ্ধা শুয়েবা বেগম। পাশের একটি স্কুলে আশ্রয়ে থাকলেও খাবার পাননি।

বন্যার পানি খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। গতকাল খাবার পৌঁছে তার আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু শুয়েবা অসহায়। খাবারের নৌকা দেখে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজন হামলে পড়ে নৌকার ওপর। শুয়েবা বেগম ওখানেও খাবার পাননি। দুপুরের দিকে বুক সমান পানি ডিঙিয়ে শুয়েবা বাড়িতে পৌঁছলেন। পৌঁছে হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ঘরের অবশিষ্ট কিছুই নেই। ঘরের খাটও নিয়ে গেছে প্রলয়ঙ্করী ঢল। আসবাবপত্র কিছুই নেই। ঘুম থেকে দৌড়ে এসেছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ঘরে এখনো কোমর পানি। কিশোরী রুপিয়া বেগম। থানা বাজার স্কুলের কেন্দ্রে আছেন তিনি। দেখা গেল বন্যার পানি তিনি থালায় নিয়ে খাচ্ছেন। জানালেন- তিনদিন হলো কিছুই খাননি। কেউ খাবার নিয়ে আসেনি। থানা বাজারের অদূরে একটি বেসরকারি সংস্থার গাড়ি ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিল। গাড়ি দেখেই রাস্তার পাশে অবস্থান নেয়া বন্যার্তরা দৌড় শুরু করলেন। শত শত মানুষ দৌড়াচ্ছে গাড়ির পেছনে। আধাঘণ্টার মধ্যে ট্রাকভর্তি খাবার শেষ।

সিলেটের বন্যার্তদের মধ্যে খাবার সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশুদ্ধ পানিও নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে তা খুবই কম। গতকাল সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জানালেন- জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিন দুই হাজার মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সবাই বন্যায় আক্রান্ত। এসব খাবার যথেষ্ট নয়। এরপরও আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবির পক্ষ থেকে গতকাল ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এদিকে- কোম্পানীগঞ্জের পাড়ুয়া গ্রামে প্রতিদিন চার হাজার মানুষকে একবেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন মিলে এই খাবারের আয়োজন করেছেন। কিন্তু যেখানে গোটা উপজেলার মানুষ হাহাকার করছে সেখানে এই খাবার যথেষ্ট নয়। বন্যার্তরা সব হারিয়েছে। এখন তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। গোয়াইনঘাটের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। খাবারের জন্য হাহাকার করছে মানুষ। গোটা উপজেলায় ৫০টির মতো আশ্রয়কেন্দ্র। মানুষ, পশু একসঙ্গে বসবাস করছে।

খাবারের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। হেলিকপ্টার দিয়ে চালানো হচ্ছে উদ্ধার। এখনো পানিবন্দি বহু মানুষ। চলছে হাহাকার। এ যেন অন্যরকম যুদ্ধ। সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর সদস্যরা প্রাণান্তর লড়াইয়ে ব্যস্ত। বন্যায় আটকে পড়াদের উদ্ধারই হচ্ছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যে যেভাবে পারছেন সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন। কিন্তু চারদিন ধরে অনেক মানুষ অভুক্ত। কেউ কেউ ঘরের চালায় বসে অপেক্ষায় আছেন উদ্ধারের। শহরে ধীর গতিতে পানি নামছে। অর্ধেক এলাকা এখনো প্লাবিত। পানিবন্দি মানুষজন ছুটছেনই। নতুন করে কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ওসমানীনগরের পরিস্থিতি ভয়াবহ। বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ, ফেঞ্চুগঞ্জের মানুষ ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। গতকাল ভোররাত থেকে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে ওইসব এলাকায়। কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। বহু স্থানে বাঁধ উপচে ঢুকছে পানি। উদ্ধারে দাবি করা হচ্ছে; সেনাবাহিনীর। কিন্তু এখনো কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, সিলেট সদর, জৈন্তাপুরে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন।

দুর্গম এলাকাগুলোয় ছুটে যাচ্ছেন তারা। উদ্ধারের পাশাপাশি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বন্যার্তদের মাঝে। এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হয়নি এসব এলাকায়। মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ। যারা উদ্ধার হচ্ছেন তাদের একেকজনের বেঁচে থাকার গল্প ভয়ঙ্কর। গতকাল উদ্ধার হওয়া কয়েকজন বন্যার্ত জানিয়েছেন- চারদিন তারা অনেকেই টিনের চালের ওপর রাত-দিন কাটিয়েছেন। প্রবল স্রোতের কারণে কেউ তাদের উদ্ধার করতে যায়নি। গতকাল সেনাবাহিনী ও পুলিশের কয়েকটি টিম গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। এই চারদিন মাথার ওপর দিয়ে ঝড়-বৃষ্টি গেছে। তারা বলেন- ঘরের কোনো কিছুই বাকি নেই। সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বন্যায়। হনুয়া নামের এক বৃদ্ধা জানিয়েছেন- এমন বন্যা তার জীবদ্দশায় দেখেননি। তীব্র বেগে ঢল নামে। এরপর সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তারা কোনোমতে টিনের চালের ওপর উঠে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। আব্দুর রহিম নামের গোয়াইনঘাটের তোয়াকুল এলাকার এক বাসিন্দা জানিয়েছেন- ঢলে তার গোয়ালঘরের সব গরু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ধানও নিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাতেই তারা টিনের চালের ওপর উঠেছিলেন। গতকাল উদ্ধার হয়েছেন।

কেউ ওদিকে যাওয়ার সাহসও পায়নি। এদিকে- খাবার সংকটের কারণে বন্যার্ত এলাকায় হাহাকার চলছে। গতকালের চিত্র ছিল ভয়াবহ। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের সদস্যরা কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার নিয়ে যান। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে অভুক্ত মানুষজন খাবার নিয়ে টানাটানি করেন। চারদিন ধরে অভুক্ত। পানিও খাননি অনেকেই। সুরমা, সারি, ধলাই নদী দিয়ে ঢলের পরিমাণ কমলেও কুশিয়ারা তাণ্ডব শুরু করেছে। কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রবল বেগে ঢুকছে পানি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চারটি উপজেলায়। নেটওয়ার্কও নেই। কী ঘটছে ওইসব এলাকায় পুরোপুরি জানা সম্ভব হচ্ছে না। তবে- ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক নিকটবর্তী এলাকার মানুষগুলোকে স্থানীয়ভাবে খাবার দেওয়া হচ্ছে। অনেক মানুষ মহাসড়কের পাশে অবস্থান নিয়েছেন। ওসমানীনগরের কালনীচর, চাতলপাড়, বিশ্বনাথের খাজানসি, লামাকাজী এলাকায় বুক সমান পানি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মানুষজন আটকা আছেন। নতুন করে ওইসব এলাকায় উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে। প্রবল স্রোতের কারণে মানুষজন যে যেখানে আটকা পড়েছেন সেখানেই রয়েছেন।

বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে: মেজর মুক্তাদির আহমদ। ১৭ পদাতিক ডিভিশনের ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের কর্মকর্তা। জানালেন- ‘পরিস্থিতি ছিল কঠিন। আমরাও আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিদ্যুৎ বোধ হয় আর ধরে রাখা যাবে না। সব কিছু পানিতে তলিয়ে যাবে। বালির বস্তা দিয়ে পানি সরাতে চেয়েছিলাম। তবে- শেষ পর্যন্ত আমরা হাল ছাড়িনি। অবিরাম কাজ চালিয়ে গেছি। সফল হয়েছি। পানিও নামতে শুরু করে।’ জানান- ‘সব ভুলে আমরা কাজে নেমেছিলাম। গলা পরিমাণ পানি। মাথার উপর মুষলধারে বৃষ্টি। টানা বজ্রপাত। এরপরও আমরা সফল হয়েছি।’ দুপুরে সিলেটের বিদ্যুৎ নিয়ে এমন কথা শুনালেন তিনি। সেই সঙ্গে জানালেন- ‘আর ব্ল্যাকআউটের সম্ভাবনা নেই। আমরা কাজ করেছি। আশা করা যাচ্ছে এখন থেকে স্বাভাবিক হবে।’ সিলেটের কুমারগাঁও বিদ্যুৎ সঞ্চালন স্টেশন। ৩৩ হাজার কেভি’র লাইন। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী শুরু থেকেই টার্গেট করেছিলেন এই বিদ্যুৎ স্টেশন। ঢল নামার দিন থেকেই তিনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজেই বালির বস্তা টেনেছেন। সেনাবাহিনী ও বিদ্যুৎ বিভাগকে সহযোগিতা করেছেন। প্রথম দিনই জানিয়েছেন- ‘ব্ল্যাকআউট হয়ে গেলে আমাদের অবস্থা সুনামগঞ্জের মতো হবে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন মানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কারো খবর কেউ পাবে না।’ এ কারণে তিনি বিদ্যুতের সঞ্চালন স্টেশনে কাজ চালিয়ে যান।

গতকাল মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন- ‘আমরা একবারের জন্য হাল ছাড়িনি। বিদ্যুৎ বিভাগ, সেনাবাহিনীর সদস্য এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা অবিরাম চেষ্টা করে সফল হয়েছেন। এখন থেকে সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে। একেক করে গোটা সিলেটেই বিদ্যুৎ যাবে। কিন্তু যেসব এলাকা বন্যা কবলিত সেসব এলাকায় নিরাপত্তার জন্য বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে না বলে জানান তিনি।’ এদিকে- সিলেটের বন্যা কবলিত উপ-শহর, ঘাষিটুলা, বেতেরবাজার, কানিশাইল, মাছিমপুরসহ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এসব এলাকা এখনো বন্যার পানির নিচে। এছাড়া- জেলার অন্তত ৮টি উপজেলায়ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- বন্যা কবলিত এলাকার জরুরি সেবা কিংবা উঁচু স্থানগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে।

বিমানবন্দর চালু হতে সময় লাগবে: রানওয়ের এপ্রোচ লাইট সচল করা গেলে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী।

তিনি দুপুরে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। এ সময় মন্ত্রী বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন- বন্যায় এয়ারপোর্টের এপ্রোচ লাইটগুলো তলিয়ে গেছে। এ কারণে বিমান অবতরণে সমস্যা হচ্ছে। পানি নেমে গেছে ফের বিমান চালু হবে। তিনি জানান- প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সিলেটের সব মন্ত্রী, এমপিরা মাঠে নেমেছেন। বন্যার্ত মানুষের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে কারণে সবাই মানুষের পাশে রয়েছেন। মন্ত্রী দুপুরে হেলিকপ্টারযোগে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। এ সময় তার সঙ্গে সিভিল এভিয়েশন সদস্য এয়ার কমোডর সাদিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

উৎসঃ mzamin