পরিচয়-বয়স গোপন করে মাদক সেবনকারী ছাত্রলীগ নেতার পুলিশে চাকরী!

পরিচয় এবং বয়সের তথ্য গোপন করে কাপাসিয়ার বহিষ্কৃত এক ছাত্রলীগ নেতার পুলিশে চাকরীর ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

এর আগে ইয়াবা সেবনের ভিডিও ভাইরাল হবার পর বহিষ্কৃত হয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কাপাসিয়া উপজেলার ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ডিগ্রি কলেজ’ শাখা ছাত্রলীগের (তৎকালীন) সভাপতি সাকিব আহমেদ সুজনের পুলিশের চাকরী নিয়ে এলাকায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

অপর দিকে সাকিবের বয়স জন্ম সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী পুলিশে যোগদানের বয়সসীমা অতিক্রম করে বর্তমানে প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে নিজের এবং তার মায়ের নামও পরিবর্তন করেছে। এক অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে তথ্য গোপন করে পুলিশে যোগদানের চাঞ্চল্যকর এ তথ্য।এরপরও কিভাবে পুলিশে চাকরী হলো এ নিয়ে সচেতন মহলে সমালোচনা চলছে।সাকিব আহমেদ সুজন উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য ভূলেশ্বর গ্রামের মো: শাহজাহান মিয়ার ছেলে।জানা যায়, কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের বিবাদিয়া দাখিল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা এন্ড ভোকেশনাল এ ২০১৪ সালে এস.এস.সি প্রোগ্রামের মানবিক শাখায় ভর্তি হয়ে ২০১৭ সালে হাফিজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৩.২৫ গ্রেড পয়েন্ট পেয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় সুজন!

পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স’র এআইজি মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম (রিক্রুটমেন্ট এন্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং-১) স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে ট্রেইনি রিক্রুট কন্সটেবল (টিয়ারসি) পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি – ২০১৮ অনুযায়ী পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগে আবেদনের জন্য প্রার্থীদের বয়সসীমা ১ জানুয়ারি-২০১৮ তারিখে ১৮ থেকে ২০ বছর হতে হবে। তবে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩২ বছর।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ থাকে যে এসএসসি বা সমমানের সার্টিফিকেটে উল্লেখিত জন্ম তারিখই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। বয়স গণনার ক্ষেত্রে কোন হলফনামা বা অ্যাফিডেবিট গ্রহণযোগ্য হবে না।

কিন্তু এক্ষেত্রেও সুজনের বয়স প্রার্থীদের নিয়োগের বয়সসীমা অতিক্রম করেছে। এস.এস.সি’র মার্কশিট অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি উল্লেখ্য আছে। সেই হিসাবে ১ জানুয়ারি-২০১৮ তারিখে তার বয়স ২০ বছর ১১ মাস ১৮ দিন হয়।

অপর দিকে জন্ম সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৯৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ্য আছে। সেই হিসাবে ১ জানুয়ারি-২০১৮ তারিখে তার বয়স ২২ বছর ১০ মাস ২৯ দিন হয়।

বিবাদিয়া দাখিল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা এন্ড ভোকেশনালের সুপার মাওলানা মফিজ উদ্দিন জানান, সুজন আমাদের ভোকেশনাল ২০১৪ সালে ভর্তি হয়ে থেকে ২০১৭ সালে এস.এস.সি প্রোগ্রামে উত্তীর্ণ হয়। এর বেশী কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে বিষয়টি নিয়ে সাকিবের পরিবারের সাথে সমঝোতার পরামর্শ দেন তিনি।

বিবাদিয়া দাখিল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা এন্ড ভোকেশনালের সহকারী সুপার মুজিবুর রহমান জানান, ভোকেশনালে ভর্তি হতে জন্ম সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রোয়োজন হয় না। ভর্তির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য ছাড়পত্র (টিসি) হলেই হয়। তার রোল ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার জানতে চাইলে তিনি এই বিষয়টি এড়িয়ে যান।

অপর একটি সূত্রে জানা যায়, নিজের নাম, মায়ের নাম এবং জন্ম সাল পরিবর্তন করে ভোকেশনালে ভর্তি হয়েছে সাকিব। সেখানে তার জন্ম তারিখ ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ এর পরিবর্তে দেখানো হয় ১ এপ্রিল ১৯৯৭। তার বাবার নাম অপরিবর্তিত রেখে নিজের নাম সাকিব মিয়ার পরিবর্তে দেখানো হয় মো সাকিল এবং তার মায়ের নাম সুমেজা খাতুনের পরিবর্তে কামরুন নাহার দেখানো হয়।

এর প্রমাণও মিলে তার জন্ম সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং হাফিজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি প্রোগ্রামে উত্তীর্ণের মার্কশিট পর্যালোচনা করে।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত সুজনের বাবা রায়েদ ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য ভূলেশ্বর গ্রামের মো শাহজাহান মিয়া সকল অভিযোগের বিষয়ে অস্বীকার করে বলেন, পারিবারিক শত্রুতার জেরে আমার ছেলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মূলক ভাবে মাদক সংশ্লিষ্টটার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি আরও বলেন, সুজন চলতি মাসের পাঁচ তারিখে পুলিশ কনস্টেবলের ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে বাড়ি ত্যাগ করে। এর বেশি আর কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।

ঘটনা সূত্রে জানা যায়, গেল বছরের আগষ্ট মাসে কাপাসিয়া উপজেলার ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ডিগ্রি কলেজ’ শাখা ছাত্রলীগের (তৎকালীন) সভাপতি সাকিব আহমেদ সুজনের ইয়াবা সেবনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তোলপার শুরু হয়েছিলো।

ঐ ঘটনায় সমালোচনার মুখে পরে উপজেলা ছাত্রলীগ মাদক সংশ্লিষ্টতা ও গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকান্ডের অভিযোগে এনে গত ২১ আগষ্ট, ২০১৭ তারিখে দলীয় পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করে।

ভাইরাল হওয়া ৪৮ সেকেন্ডের ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, সুজন একটি অটো রিক্সায় বসে ইয়াবা সেবন করছে, তাকে সাহায্য করছে পাশে থাকা অন্য আরেকজন। যার চেহারা অস্পষ্ট থাকায় তার পরিচয় জানা যায়নি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২১ আগষ্ট উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত কারণ দর্শানোর নোটিশে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র বিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে সাকিব আহমেদ সুজনকে দলীয় পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এবং পরবর্তীতে নোটিশের জবাব না দেয়ায় তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন সুজন দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালনা ও মাদক সেবন করতো। এ বিষয়ে ব্যাপক ভাবে সমালোচনার মুখে পরে উপজেলা ছাত্রলীগ তাকে দলীয় পদ থেকে বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারের পর সুজনকে আর তার নিজ এলাকায় দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় একাধিক সূত্র।

এ ব্যাপারে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারের পর সুজনকে আর এলাকায় দেখা যায়নি। গত কিছুদিন আগে তার ব্যাপারে পুলিশ ভূলেশ্বর গ্রামে তদন্ত করতে গেলে সুজনের পুলিশের চাকরীর বিষয়টি জানাজানি হয়। হঠাৎ করেই ২০১৮ সালের সর্বশেষ পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে তার নাম দেখে তার নিজ এলাকায় এ নিয়ে আবারো আলোচনার সৃষ্টি হয়।

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হবার পর বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে মাদকাসক্ত সুজনের চাকরী পাওয়া নিয়ে এলাকায় বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসের তিন তারিখে বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের মহা পরিদর্শকের বরাবর একটি অভিযোগ দায়ের করে এলাকাবাসীর পক্ষে স্থানীয় এক ব্যাক্তি। ঐ অভিযোগ সূত্রে জানা যায় বাংলাদেশ পুলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাহীনিতে দায়িত্বভার একজন মাদক বিক্রেতা ও মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে দেয়া যেতে পারে না। এতে করে বাংলাদেশ পুলিশের সুনাম নষ্ট হবার আশংকা রয়েছে। তাই উক্ত বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেন তিনি।

সুজনের পুলিশ চাকরীর বিষয়টি নিশ্চিত করে রায়েদ ইউনিয়নের চেয়াম্যান মোঃ আঃ হাই বলেন, মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিলো তার বিরুদ্ধে। এরপরেও বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল পদে তার নিয়োগ হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম ভূঁইয়া বলেন, গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাকিব আহমেদ সুজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়েছিল এবং সময়মতো তার জবাব না দেয়ায় তাকে স্থায়ীভাবে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ইয়াবা সেবনের ছবি এবং ভিডিও ফেসবুকে ভাইরালের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

amardesh247.com