দেশে ষড়যন্ত্র করে ‘আরেকটি ১/১১’র আয়োজন চলছে’

২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রসঙ্গ টেনে যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ বলেছেন, দেশে আরেকটি এক-এগারোর আয়োজন চলছে। তবে বাংলাদেশের যুবসমাজ এ ষড়যন্ত্র বরদাশত করবে না।

সোমবার (৩০ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে যুবলীগ চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। নগরীর পাঁচলাইশে কিং অব চিটাগং কমিউনিটি সেন্টারে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছে। জাতীয় ও সংগঠনের পতাকা এবং বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের পরিকল্পিত নীলনকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যেন এই সরকারের ওপর আশা হারিয়ে ফেলে- সেই চক্রান্ত হচ্ছে। এই চক্রান্ত বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে এক-এগারোর কুশীলবরা। জাতীয় সরকারের তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে। এরপর কিছু ব্যক্তি সরব হয়েছেন। আজ তিন মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার দেশ পরিচালনা করছে। সুতরাং শেখ হাসিনাকে হটাতে হবে- এটা সুশীলদের হিসাব। তারা শুরু করেছে সেই পুরনো খেলা। চারদিকে হতাশার নানা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে।’

‘কয়েকজন সুশীল সম্প্রদায়ের লোক, নিয়ন্ত্রিত কিছু গণমাধ্যম, ক্ষমতার উচ্ছ্বিষ্ট মধু খাওয়া কিছু লোক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ কেউ মিলে আরেকটি এক-এগারোর আয়োজনের চেষ্টা করছে। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আগে কলাকুশলীরা গ্রিনরুমে অপেক্ষা করছে। তাদের এই অপেক্ষা অপেক্ষাই রয়ে যাবে। বাংলাদেশের যুবসমাজ এসব ষড়যন্ত্র বরদাশত করবে না।’

পরশ বলেন, ‘সুশীলদের দাবি– নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। অর্থাৎ তাদের পছন্দের অগণতান্ত্রিক, অনির্বাচিত শক্তির হাতে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কী কারণে? সুশীলদের ক্ষমতার জন্য, সুশলীদের সুবিধাবাদী উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য? স্পষ্ট বলতে চাই, আগামী নির্বাচন জননেত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই হবে। শেখ হাসিনার থেকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য, বেশি নিরপেক্ষ আর কেউ নেই। তিনি নিরপেক্ষতার মূর্ত প্রতীক। শেখ হাসিনা নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা-নিরপেক্ষতার প্রমাণ ইতোমধ্যে দিয়েছেন।’

৭৫ পরবর্তী সুশীল সমাজের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘হলিডে, গণকণ্ঠ পত্রিকা বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এক শ্রেণির ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী দেশ চলে গেছে বলে আর্তনাদ শুরু করেছিল। মুনাফাখোর, কালোবাজারিরা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। সব মিলিয়ে পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভা ছিল একটা আইওয়াশ। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর একটা অসাংবিধানিক উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। কিছু নামকরা বুদ্ধিজীবী ও সুশীলরা ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে ওই পরিষদে যোগ দেয়। কিন্তু তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদ করেনি, শিশু রাসেলকে হত্যার প্রতিবাদ করেনি। ক্ষমতা পেয়ে তারা গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার সব ভুলে গিয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে এরশাদ। সেই এরশাদের সঙ্গেও সেই বুদ্ধিজীবী আর সুশীলরা। পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- একটি সুশীল গোষ্ঠী, কিছু গণমাধ্যম, সরকারের ভেতরে থাকা কিছু ষড়যন্ত্রকারী এবং আন্তর্জাতিক চক্র এক হয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে।’

বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে পরশ বলেন, ‘নব্বইয়ে এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে একটা গণতান্ত্রিক ধারার সূচনা হয়েছিল। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের নাটাই ছিল অনির্বাচিত সুশীলদের হাতে। নির্বাচনের আগে একটা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হতো, তাদের হাতে থাকত অসীম ক্ষমতা। ৯১, ৯৬, ২০০১- এই তিন মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে দলকে চেয়েছে তাদের ক্ষমতায় এনেছে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের আড়ালে ক্ষমতার চাবি চলে গিয়েছিল অনির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে।’

‘২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নির্বাচনের আগেই হেরে গেল আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে নির্যাতন-নিপীড়ন, দুর্নীতি-লুটপাট এমনভাবে শুরু করে, মানুষ তাদের হটাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তখনই সুশীলরা তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম নিয়ে আবারও তৎপর হয়ে ওঠে’- বলেন শেখ ফজলে শামস পরশ।

ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পরশ বলেন, ‘নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রচারণা শুরু হয়-বিএনপি খারাপ, আওয়ামী লীগও খারাপ। বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুই দলই ব্যর্থ। এভাবে সুশীলদের মাঠে নামানোর মঞ্চ তৈরি করা হয়। সুশীলদের নেতা নির্বাচন করা হয় এই চট্টগ্রামের একজন অর্থনীতিবিদকে। তার হাতে তুলে দেওয়া হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার। চারদিকে ব্যর্থতার হাহাকার দেখিয়ে ভীতি সঞ্চার করা হয়। মঞ্চে আর্বিভূত হয় সুশীলরা। সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত নিয়ে ক্ষমতায় আসে অনির্বাচিত সরকার, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সংবিধান অনুযায়ী একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন। কিন্তু সুশীল সংবিধান বিশেষজ্ঞরা ফতোয়া দিলেন- না না সবকিছু ঠিক আছে।’

তিনি বলেন, ‘সেই সময় একমাত্র শেখ হাসিনা বুঝেছিলেন- এটা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তিনি বুঝেছিলেন- জনগণের ক্ষমতার চাবি আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে সুশীলদের সিন্দুকে বন্দী। তারপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলো।’

সেই এক-এগারোর প্রেক্ষাপট তৈরিতে এখনও কিছু গণমাধ্যম সক্রিয় অভিযোগ করে যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, ‘কিছু কিছু গণমাধ্যম এখন বিরোধীদলের ভূমিকায় নেমেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ওই সমালোচনা যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তাহলে সমালোচনা করার অধিকার জনগণেরও রয়েছে। কিছু কিছু পত্রিকা এরকম কাজ করছে। দেশটাকে ঝুঁকিপূর্ণ, সংকটময় চালানোর চেষ্টা করছে। সরকার ব্যর্থ এটা প্রমাণ করতে তারা মরিয়া।’

উন্নয়ন সহযোগীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কিছু উন্নয়ন সহযোগী আছে, যারা দেশে শক্তিশালী সরকার চায় না। ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এদের অস্বস্তিতে ফেলে। রাজনীতিবিদদের ছেড়ে এরা সুশীল বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পছন্দ করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন নয়, এদেশের বাজার দখলই তাদের প্রধান স্বার্থ। মুখে এরা গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকারের কথা বলে। বাস্তবে এদের বিরোধী শক্তির সঙ্গে এরা গোপন সখ্য গড়ে তোলে। এসব কারণে একটি গণতান্ত্রিক সরকার সংকটে পড়ে। তখনই একটি অগণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি হয়।’

সুশীল সমাজের উদ্দেশে যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, ‘ক্ষমতার লোভে আপনাদের এসব অপরাজনীতি বন্ধ করুন। যদি দেশকে ভালোবাসেন, গঠনমূলক বিরোধিতা করুন। কোনো জাতীয় সংকটে তো আপনাদের জনগণের পাশে দেখলাম না। যখন দেখলেন সরকারের মেয়াদ শেষ, তখন একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। তা-ও কীভাবে? বিদেশর সঙ্গে ফন্দি করে। কিছু মনে করবেন না, নতুন প্রজন্ম আপনাদের বিশ্বাস করে না। আপনাদের ষড়যন্ত্র এদেশের যুবসমাজ বুঝতে পারে। গঠনমূলক রাজনীতি আর দেশের উন্নয়নের দিকে নজর দেন। তাহলে কোনো একদিন হয়তো সফল হবেন। বিভ্রান্তি আর প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে কোনো লাভ হবে না।’

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহবায়ক মহিউদ্দীন বাচ্চুর সভাপতিত্বে এ সময় আরও বক্তব্য দেন- আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। নগর যুবলীগের চার যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন খোকা, ফরিদ মাহমুদ, মাহবুবুল হক সুমন ও দিদারুল আলম অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
খবরের সূত্র :সারাবাংলা