এনজিওর আড়ালে নারী পাচার করে যে বেসরকারি সংস্থা

এনজিওর আড়ালে নারী পাচার করে যে বেসরকারি সংস্থা ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে নেওয়া হয় দুবাইয়ে। এরপর সেখান থেকে পাচার করা হয় ওমানে। বাংলাদেশ থেকে নারীদের পাচারে মিসেস রুবি নামে একজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তার সহযোগী হিসেবে কাশি বর্ধন ও মিলি আক্তার নামে দুজন জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাশিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গ্রেফতার করতে পারলেও রুবি পলাতক। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্রেফতারি পরোয়ানার পর ওই দুজন আদালত থেকে জামিন নেন। এ ছাড়া মিলি আক্তার রয়েছেন দুবাইয়ে। তিনজনের বাড়িই নরসিংদীর শিবপুরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিসেস রুবি নিজেকে বাংলাদেশি মাইগ্রেন্ট ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন নামে একটি এনজিওর কর্মী বলে পরিচয় দিতেন। ওই এনজিওর আড়ালেই তিনি অন্তত ২০ জন নারীকে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন একই এনজিওর কর্মী দাবি করা আরেকজন।২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর রাজধানীর রামপুরা থানায় একটি মামলা করেন মমিনা (ছদ্মনাম) নামের এক নারী। তার বয়স ৪৫। মামলা নম্বর-২৯। এ মামলায়ই রুবি, কাশি ও মিলি ছাড়াও অজ্ঞাত আরও তিন-চারজনকে আসামি করা হয়েছে। গত বছর ১৩ সেপ্টেম্বর এ মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছেন সিআইডির পরিদর্শক মো. রাসেল।

মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মমিনা রামপুরা এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। একপর্যায়ে রুবি তাকে দুবাইয়ে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখান। পাসপোর্ট ও ভিসার জন্য তার কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন রুবি। ২০১৫ সালের ১৮ মে ওই নারীকে দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর বিমানবন্দর থেকে এক ব্যক্তি তাকে রিসিভ করে অজ্ঞাত একটি স্থানে ১০ দিন তালাবদ্ধ করে রাখেন। ওই স্থানে তাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে ওমানে পাচার করে দেওয়া হয় তাকে। তার সঙ্গে আরও ২০-২৫ জন বাংলাদেশি নারীকে ওমানে পাচার করা হয়। ওমানে নেওয়ার পর মমিনাকে আরও নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে ওই নারী দেশে ফিরতে চাইলে তার কাছ থেকে আরও ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়। মমিনার স্বজনরা বাংলাদেশে রুবিকে ১ লাখ টাকা দিলে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। এসব ঘটনায় পাচারের শিকার হওয়া আরও দুই নারী তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া ঘটনা সম্পর্কে জানতে আরও পাঁচ ব্যক্তি আদালতে তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা মো. রাসেল তার প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, রুবি, কাশি ও মিলি একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার দলের সক্রিয় সদস্য। তারা দেশের নিরীহ ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করে উন্নত দেশে ভালো চাকরির আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর তাদের দুবাই, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে আটকে রাখেন। সেখানে মৃত্যুর ভয়ভীতি দেখিয়ে আরও টাকা হাতিয়ে নিতে তাদের ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালান তারা। এদিকে বাংলাদেশি মাইগ্রেন্ট ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব দাবি করা মোহাম্মদ আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘রুবি আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্ম করেছেন। তিনি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে জাল পাসপোর্ট থেকে শুরু করে ফিঙ্গার প্রিন্ট, ম্যান পাওয়ার নিয়ে মানব পাচার করে আসছেন। রাজধানীর দারুস সালামের নারী অভিবাসী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গার্মেন্ট, বিভিন্ন বাসাবাড়ির কাজের মেয়েদের পাচার করে আসছেন রুবি।

এই বেসরকারি সংস্থার নাম ভাঙিয়ে মানব পাচার করে রুবি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।’ মমিনা জানিয়েছেন, ‘ওমানে পাচার হওয়ার এক মাস পর অনেক কষ্টে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এরপর তারা জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে ১ লাখ টাকা জোগাড় করে রুবিকে দেন। রুবি টাকা পাওয়ার পরই ওমানে থাকা মানব পাচারকারীরা তাকে ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন।’ বেসরকারি সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর তরিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, ওমানে নারী শ্রমিকের ভিসা নিয়ে অন্য কাজে লাগানোর ঘটনা বেশি। সেখানে একটি প্রসেসিং নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ওই দেশে নারী পাচার হওয়ার সঠিক সংখ্যা একমাত্র বিএমইটি বলতে পারবে। কারণ যারা শ্রমিক হিসেবে যান তাদের সবার তথ্য তাদের কাছে থাকে। যখন ওই দেশে একটি নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে তখন এখান থেকে তা প্রতিরোধ করা কঠিন। কিন্তু ওই দেশে তদন্ত কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।

এদিকে ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর মামলার সংখ্যা বাড়লেও বিচারে দেখা গেছে কচ্ছপগতি। পুলিশ সদর দফতরের গত বছর নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের মানব পাচার মামলার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের ১৫ জুন থেকে গত বছর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৭ হাজার ১৭৯টি মামলা হয়েছে। এর ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৮০৭ জন। এদের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ১০ হাজার ৮৮ জনকে। এদের পাচারে সম্পৃক্ততায় ২৯ হাজার ৫৩০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর গ্রেফতার করা গেছে ১৩ হাজার ৫৬২ জনকে। এসবের মধ্যে গত বছর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৮১২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। সাজা হয়েছে ৪০৯ জনের। খালাস পেয়েছেন ১ হাজার ৭২১ জন। মৃত্যুদণ্ড হয়েছে ৮ জনের। যাবজ্জীবন হয়েছে ২৯৯ জনের।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের গত বছরের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গত বছর বিভিন্ন থানায় মানব পাচার-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৫৫৪টি। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ৩৬৬টি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ৪০টির। গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের হিসাবে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ৬ হাজার ৯৫টি। তবে চলতি বছর জানুয়ারিতে মানব পাচারের মামলা হয়েছে ৪৮টি। গত বছর কোনো মামলায়ই কোনো আসামির শাস্তি হয়নি। বরং খালাস পেয়েছেন পাঁচজন।.bd-pratidin.