‘যুগপৎ’ আন্দোলনের পথেই বিএনপি : নতুন পরিকল্পনা

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ আরও কয়েক দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের পথে হাঁটছে বিএনপি। এ নিয়ে দলটি একটি রূপরেখাও তৈরি করছে।

বিএনপি নেতাদের মতে, রোজার ঈদের আগে ৩০টিরও বেশি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথা বলেছেন তারা। দলগুলো বিএনপির দাবিগুলোর সঙ্গে একমত হলেও এখনই বৃহত্তর ঐক্যের পক্ষে নয়। তারা অভিন্ন দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী। এজন্য কর্মসূচির ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে রাজপথে ঐক্য গড়ে তোলাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

বিএনপি ও বাম ঘরানার একাধিক নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে চারটি মঞ্চ থেকে এই যুগপৎ আন্দোলন হতে পারে। তা হলো-বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট; আ স ম আব্দুর রবের জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জোট ও ইসলামি দলগুলোর জোট।

এছাড়া কোনো জোটের সঙ্গে না থেকে জামায়াতে ইসলামী পৃথকভাবে আন্দোলন করার বিষয়ে বিএনপি নেতাদের জানিয়েছে। এ নিয়ে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতারা কাজ করছেন। চলতি মাসের শেষে আথবা আগামী মাসের শুরুর দিকে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ এক সিনিয়র নেতার লন্ডন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দলটির সাংঠনিক পুনর্গঠন, আন্দোলন ও নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে বলে বিএনপির একটি সূত্র যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র আরও জানায়, বিএনপির ওই নেতা লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর একটি রূপরেখা বা কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এর ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। সরকারবিরোধী যেসব দল ওই কর্মসূচিকে সমর্থন করবে, তারাই যুগপৎ আন্দোলনে শামিল হবে বলে আশা করছে দলটি।

বিএনপি নেতাদের মতে, যুগপৎ ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সরকারবিরোধী আন্দোলন একই পথে গিয়ে দাঁড়াবে; যেটিকে রাজপথের ঐক্য বলে তারা মনে করেন। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘সময়মতো’ দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে চায় বিএনপি। তার আগ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে চলমান নানা ইস্যুতে বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকবে। এর কারণ হিসাবে দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক

যুগান্তরকে জানান, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে, বিএনপিকে এখনই মাঠে নামাতে নানা ইস্যু সামনে নিয়ে আসছে সরকার। তবে এবার সরকারের ফাঁদে আর পা দেবে না বিএনপি। কারণ বড় ধরনের কর্মসূচি দিয়ে এখনই মাঠে নামলে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার করে পরিস্থিতি সরকার তাদের অনুকূলে নিয়ে নেবে এবং নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এ নিয়ে ‘দর কষাকষি’ করবে বলে ধারণা নেতাদের। তাই আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে খুব সতর্কতার সঙ্গে কর্মসূচিসহ সব কর্মকাণ্ড চালানোর কৌশল নিয়েছে দলটি। সময়মতোই মাঠে নামতে চায় তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির আন্দোলনের রূপরেখার মধ্যে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, সব দলের মতামতের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহার, খালেদা জিয়ার মুক্তি, সাজা বাতিল করে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনাসহ আরও বেশ কয়েক দফা দাবি থাকবে। এসব দাবি ঘোষণার পর সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে।

ওই সংলাপে দলীয় কোনো কর্মসূচির ব্যাপারে দলগুলোর আপত্তি থাকলে বিএনপি তাতে ‘ছাড়’ দেবে। পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনে আগ্রহী দলগুলোর কোনো দাবি থাকলে সেগুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এভাবেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এবং অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলতে চায় বিএনপি।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আমরা খুব স্পষ্টভাবে বলেছি, বর্তমান অবৈধ হাসিনা সরকারের অধীনে বিএনপি কোনো নির্বাচনে যাবে না। এই সরকারকে বিদায় নিতে হবে। নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। ওই সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করার পর তবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, পরিবেশ তৈরি হবে। তাই দাবি আদায়ে বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। তবে যুগপৎ আন্দোলন কিনা সেটি সময় ও পরিস্থিতি বলে দেবে। আন্দোলন শুরু হলে তার গতিই বলে দেবে আমরা কোন দিকে যাব।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সমমনা দলগুলোকে নিয়ে বিএনপি আন্দোলন গড়ে তুলবে। আর এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই রাজপথে ঐক্য গড়ে উঠবে।

মূলত ২০ দলীয় জোটভুক্ত কয়েকটিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের উদারপন্থি কয়েকটি দল এবং সরকারের বাইরে থাকা বামপন্থি দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠন করতে চায় বিএনপি। একটা সময় ইসলামি দলগুলোও ওই আন্দোলনে শামিল হবে বলে মনে করে দলটি। তবে বাম দলগুলোকে নিয়ে একসঙ্গে চলার পথে প্রধান বাধা জামায়াতে ইসলামী। সূত্রমতে, জামায়াতকে জোটে রাখা না রাখা নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে।

বিএনপির একটি অংশ জামায়াতকে ছাড়ার পক্ষে। তবে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, আগামী নির্বাচন ও আন্দোলন ইস্যুতে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির একটি ‘বোঝাপড়া’ হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধভাবে কোনো কর্মসূচিতেও যাবে না বিএনপি। নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে জামায়াত এককভাবে কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকবে।

এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে জানান, জামায়াতে ইসলামী ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটেরও হিসাব-নিকাশ আছে। সেক্ষেত্রে জামায়াতেরও কিছু ভোট রয়েছে। আর বিএনপি যদি জামায়াতকে জোটে না রাখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে তাদের নেবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে। অতীতে তো এ রকম ঘটনার উদাহরণ আছে।

যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে একমত সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও। জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের উদ্যোগটা ভালো। আমি স্বাগত জানাই। কিন্তু সেই আন্দোলনের চরিত্র বা শেপ কেমন হবে সেটি দেখতে হবে।

বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে আমরাও ইতিবাচক। কিভাবে যুগপৎ-এ কাজ করবে এ বিষয়ে রূপরেখা থাকলে আমাদের ভালো হয়। আমরা সবাই চাই এই সরকারের পতন। তাই তা কিভাবে করা হবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, যুগপৎ আন্দোলনই করতে চাই। আমাদের সাত দলের একটা মঞ্চ হচ্ছে। তবে এ মঞ্চে জামায়াতসহ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কোনো জায়গা হবে না। আর বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের একটি মঞ্চ হচ্ছে। পাশাপাশি ইসলামী শক্তি যদি আসতে চায় তারা আলাদা একটি মঞ্চ করুক। তিন বা চারটি মঞ্চ থাকতেই পারে। সেই মঞ্চ থেকে আমরা আন্দোলন করব। ফ্যাসিস্ট সরকার নামাতে হলে আমরা একা পারব না, তাই যুগপৎ আন্দোলনই ভালো। সবাইকে নিয়ে নামতে হবে।

এদিকে একটি সূত্র জানায়, ২০ দলীয় জোট ঠিক রেখে আরেকটি জোট গঠন হতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আর থাকবে না বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। তারা জানান, যেহেতু এ ফ্রন্ট নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই বিকল্প আরেকটি জোট গঠনের বিষয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে।

সূত্রমতে, আ স ম আব্দুর রবের জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, ড. রেজা কিবরিয়ার বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদসহ সাত দল ও সংগঠন একটি জোট গঠনের তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের দাবির সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে বিএনপির। এই জোটে মোস্তফা মহসীন মন্টুর গণফোরামসহ আরও বেশ কয়েকটি দল ও সংগঠন অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই জোটকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিকল্প জোট হিসাবে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়াও গত নির্বাচনে আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জোট যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে থাকা কয়েকটি দলও এ জোটে যোগ দিতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।

উৎসঃ Jugantor