প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন : দুই কারণে সামনে মানুষের অনেক কষ্ট হবে ?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সারা বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে- এর ধাক্কা সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। মানুষের অনেক কষ্ট হবে। সেটা যেন আমাদের দেশে না হয়, সেজন্য দেশের প্রত্যেক মানুষ এবং প্রতিটি পরিবারকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

সোমবার (১৬ মে) এসডিজি বাস্তবায়ন পর্যালোচনাবিষয়ক দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন-২০২২’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রান্তে যুক্ত ছিলেন।

জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সরকার সচেষ্ট হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বাস্তবায়নে আমাদের সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, জাতিসংঘ ঘোষিত ‘এসডিজি অর্থাৎ এজেন্ডা-২০৩০’ তথা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নে আমরা সক্ষম হব। তবে মাঝখানে করোনাভাইরাস এবং সেইসঙ্গে বর্তমানের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এটা পুরো বিশ্বকে অনেকটা স্থবির করে দিয়েছে। তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে।’

এসডিজি একটি বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণা হলেও বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ পরিক্রমার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসডিজি প্রণয়নের প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামত নিয়ে ২০১৩ সালে আমরা জাতিসংঘের কাছে মোট ১১টি অভীষ্টের প্রস্তাব করেছিলাম। এর মধ্যে ১০টিই জাতিসংঘ হুবহু অনুসরণ করেছে। ফলে এসডিজি প্রণয়নকাল থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতি-কৌশল এসডিজির আদলে প্রণয়ন করা সম্ভব হয়েছে।’

২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা প্রণয়নে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে (লিড/কো-লিড ও অ্যাসোসিয়েট) মন্ত্রণালয়/বিভাগ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণের জন্য কী পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত রয়েছে ও নতুন কী তথ্য প্রয়োজন তার স্টাডি করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নে কী পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের প্রয়োজন তাও চিহ্নিত করা হয়েছে।’ সব মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক এসডিজি বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি জানান, এসডিজি বাস্তবায়নের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। তার নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সচিবগণকে নিয়ে এসডিজি বাস্তবায়ন পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নে কার্যকর সক্ষমতা অর্জনে মন্ত্রণালয়-ভিত্তিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সব মধ্য ও দীর্ঘ-মেয়াদী পরিকল্পনা দলিল এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাকে বিবেচনায় নিয়েই প্রণয়ন করেছি। সর্বশেষ গৃহীত অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাকে পরিপূর্ণভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকার গঠনের পর দেশের সকল মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাসহ সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনের নিরিখে বিশেষ বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

আধুনিক প্রযুক্তি-জ্ঞানসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ে ‍তুলতে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শতভাগ বিদ্যুতায়নের দিক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এসডিজিকে কেবল একটি বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণা হিসেবে গ্রহণ করেনি, বরং বৈশ্বিক এ লক্ষ্যমাত্রাকে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিজের উপযোগী করে প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু করেছে। যা এসডিজি স্থানীয়করণ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ১৭টি অভীষ্ট হতে ৩৯টি সূচককে বাংলাদেশের জন্য ‘এসডিজি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।”

শেখ হাসিনা জানা, সেইসঙ্গে প্রতিটি জেলা এবং উপজেলার বাস্তবতা বিবেচনায় একটি করে অতিরিক্ত সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করা যায়, এই অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সকল সরকারি দপ্তরে দ্রুততা ও সফলতার সঙ্গে এসডিজি পরিবীক্ষণ এবং বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং দেশের চলমান উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে।

তিনি বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের পথে আমরা সাত বছর অতিক্রম করেছি। দুই বছর কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির কারণে এসডিজি বাস্তবায়ন গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। তবে আমরা আমাদের সামর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের পক্ষ হতে সময়োচিত প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান ও যথাযথ নীতি সহায়তা প্রদানের কারণে অর্থনীতি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসছে। নির্দিষ্ট সময়ে এসডিজি’র পথ পরিক্রমা নিশ্চিত করা কঠিন, তবে আমি বিশ্বাস করি সঠিক ও উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা এবং কার্যকর পরিবীক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখনকার প্রেক্ষিত যথেষ্ট পরিবর্তন হয়ে গেছে। সারা বিশ্বব্যাপী একটা অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। এমনকি খাদ্যের অভাব দেখা দিচ্ছে। আমাদের দেশে জমি আছে, মানুষ আছে। আমি এরইমধ্যে নির্দেশ দিয়েছি, এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি থাকবে না। দেশবাসীকে বলব প্রত্যেকে যার যতটুকু সামর্থ্য আছে নিজের খাদ্য উৎপাদন করা, সাশ্রয় করা এবং নিজের খাদ্য ব্যবহার করা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের যা আছে। সবগুলো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সবাইকে একটু সাশ্রয়ী হতে হবে। পানি-বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। খাদ্যশস্য ব্যবহারে প্রতিটি ক্ষেত্রে সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নে আমরা যে পর্যালোচনা করব সেখানেও ক্ষেত্রগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে নিতে হবে। কোনরকম অপচয় যেন না হয়। অপচয় পরিহার করে সুষ্ঠু অর্জন যেন আমরা করতে পারি, বা বাস্তবায়ন করতে পারি সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ আশু করণীয় বা এই মুহূর্তে করতে হবে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বা যেগুলো এক্ষুনি প্রয়োজন নাই বা দীর্ঘমেয়াদী সেগুলো বেছে নিতে। এভাবে যদি পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারি তাহলে আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।’

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই দেশের উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেরও বিশাল দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন- পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ। এছাড়া সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য এবং সচিব ড. মো. কাউসার আহাম্মদ এসডিজিবিষয়ক একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন।

সারাবাংলা