সেই মারধরের শিকার পরিবারটি যেখান থেকে জাফলং গিয়েছিলো

মারধর শিকার সেই পরিবারটি-ঢাকা থেকে প্রকৃতি কন্যা জাফলংয়ে বেড়াতে গিয়ে পর্যটন উন্নয়ন কমিটি কর্তৃক নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে মারধরের শিকার হয়েছে একটি পরিবার। বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে টিকিট কেনা নিয়ে পর্যটকদের সঙ্গে জাফলং পর্যটনকেন্দ্রের কাউন্টারে থাকা উপজেলা প্রশাসনের কর্মীদের বাগবিতণ্ডা হয়।

একপর্যায়ে কাউন্টারে থাকা কর্মীরা লাঠি দিয়ে পর্যটকদের মরধর করেন। এ সময় কয়েকজন নারীকেও লাঞ্ছিত করেন তারা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টিকিট কাটা নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে পর্যটকদের ওপর চড়াও হন উপজেলা প্রশাসনের স্বেচ্ছাসেবীরা। সে সময়ের বেশ কিছু ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্বেচ্ছাসেবক লেখা নীল ইউনিফর্ম পরা তিনজন হাতে লাঠি নিয়ে একদল পর্যটককে বেধড়ক পেটাচ্ছেন। এ সময় কিছু নারী পর্যটকও লাঞ্ছিত হন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলার শিকার পর্যটকেরা ঢাকা থেকে সিলেটে বেড়াতে এসেছিলেন। এ সময় জাফলংয়ের ভ্রমণের টিকিট না কেটে জিরো পয়েন্টের দিকে নেমে যান।

একপর্যায়ে টিকিট কাউন্টারে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরা ওই পর্যটকদের ডেকে নিলে এ নিয়ে কথা–কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম নজরুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত পর্যটকদের ওপর হামলার অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের পর গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

এদিকে এ ঘটনার পর উঠে এসেছে নেপথ্যে উন্নয়ন কমিটির নামে ‘চাঁদাবাজি’। স্থানীয় কতিপয় নেতাকর্মী তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা স্বেচ্ছাসেবক চক্র। চক্রের সদস্যরা লাখ লাখ পর্যটকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। এর নেপথ্যে আছেন ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতাকর্মী, যারা জাফলং শাসন করেন। এজন্য উপজেলা প্রশাসন ও পর্যটন উন্নয়ন কমিটিকে দায়ী করছেন বিভিন্ন মহল।

পরিচ্ছন্নতার নামে ১০ টাকা চাঁদা আদায়ের ঘটনা জানে না জেলা পুলিশও। যদিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিলুর রহমান বলেন, চাঁদা আদায়ের সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, এটা চাঁদা নয়, প্রবেশ ফি হিসেবে আদায় করা হচ্ছে, যে টাকা উন্নয়ন খাতে ব্যবহার হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক পর্যটন এলাকায় প্রবেশ ফি বা চাঁদা আদায়ের যৌক্তিকতার প্রশ্নে তিনি বলেন, জেলা উন্নয়ন কমিটি নির্ধারণ করে দিয়েছে, উপজেলা প্রশাসন কেবল বাস্তবায়ন করেছে।

পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন বলেন, উপজেলা প্রশাসন এই ফি কিভাবে নির্ধারণ করেছে? এটা কিসের টাকা? কি হিসেবে তোলা হচ্ছে? এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গেও কোনো সমন্বয় করা হয়নি। এটা উপজেলা প্রশাসনই বলতে পারবে। তবে পর্যটক হযরানির ঘটনা এখন থেকে তদারকিতে নেওয়া হচ্ছে। আজ যা ঘটেছে, এটা কেটল জাফলংয়ের জন্য নয়, পুরো একটি অঞ্চলের জন্য বদনামের।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সনাক সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ বলেন, জাফলং পর্যটন কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করছে বহিরাগত ও স্থানীয় কতিপয় দুর্বৃত্তরা। সেই সঙ্গে আমলারাও দায়ী। নয়তো, প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ ফি কেমনে নির্ধারণ করা হয়, প্রশ্ন রাখেন তিনি। তারা সিলেটের পর্যটনকে ধ্বংস করতে চাচ্ছেন। তাদের কাছে জাফংয়ের বদনাম হলেও কিছু যায় আসে না।

পর্যটকদের ভ্রমণ সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ট্যুর সিলেটের স্বত্বাধিকারী সাংবাদিক, প্রভাষক সালমান ফরিদ বলেন, একটি পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের লাঞ্ছিত করা মানে ওইস্থানে আর না যেতে নিরুৎসাহিত করা। পর্যটকরা এই স্থানকে অনিরাপদ মনে করবেন। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ প্রশাসন দায় এড়াতে পারেন না। আর হামলাকারী এরা কারা, তাদের কে বা কারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, কার স্বার্থে দিয়েছেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিলুর রহমান আরো বলেন, ১০ টাকা আদায়, এটাকে চাঁদা বলা যাবে না, এটা উন্নয়ন ফি। জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি নির্ধারণ করে দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন কেবল বাস্তবায়ন করেছে। তবে ১০ টাকা চাঁদার বিনিময়ে পর্যটকদের কাপড় পরিবর্তনের জন্য ‘চেঞ্জিং সুবিধা কক্ষ ও ওয়াইফাই’সহ অনেক সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে।

পর্যটন উন্নয়ন করপোরেশনতো বরাদ্দ দিয়ে থাকে তাহলে উপজেলা প্রশাসন কেনো প্রবেশ ফির নামে চাঁদা নিচ্ছে এবং কার স্বার্থে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বেচ্ছাসেবক ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নের কাজে আমরা এই টাকা ব্যয় করে থাকি। তবে এ নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, এটা খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনায় জড়িতরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি জাফংলয়ে ২৭ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়েছিল। পর্যটন এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য ১০ টাকা মূল্যের টিকিটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পর্যটন এলাকায় টিকিট কাউন্টারে তর্কাতর্কির জেরে পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, বর্বরোচিত। এটার রেশ পড়বে পুরো জাফলং পর্যটন কেন্দ্রের ওপর। হামলাকারী স্বেচ্ছাসেবকদের ইতোমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ঈদের দিনগুলোতে প্রবেশ টিকিট বিক্রি ও ছবি তোলার নামে স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কতিপয় যুবক পর্যটকদের সঙ্গে চাঁদাবাজি করছিলেন। একটি ছবি তুলে তারা পর্যটকদের জিম্মি করে ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জের ধরে পর্যটক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় থাকা কতিপয় যুবক পর্যটকদের ওপর বেপরোয়া হয়ে হামলা চালান। তারা বাঁশের লাঠি দিয়ে পর্যটকদের পেটাতে থাকেন।

এ সময় তরুণীরা তাদের সঙ্গীদের বাঁচাতে এগিয়ে গেলে তাদেরও মারধর, হেনস্তা করা হয়। স্থানীয়রা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। ঘটনার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. লুৎফর রহমান। এ বিষয়ে জানতে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।