আড়াই টাকা অনিয়মে চাকরিচ্যুত, ৪০ বছর পর ফেরত পেলেন বেতন-ভাতা!

মাত্র আড়াই টাকা অনিয়মের অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক আদালতে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওবায়দুল আলম আকন। জেল-জরিমানাও হয়েছিল সে সময়ের এই পাট সম্প্রসারণ সহকারীর। অবশেষে তিন যুগ পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রিভিউ রায়ে আকন ফিরে পাচ্ছেন তার হারানো চাকরির সব বেতন-ভাতা।

সোমবার (২৮ জুন) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারকের আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওবায়দুল আলম আকন কুষ্টিয়ার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পাট সম্প্রসারণ সহকারী হিসেবে ১৯৭৪ সালে চাকরিতে যোগ দেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি সরকারের কাছ থেকে পুরস্কারও পান। এরই মাঝে ৫ প্যাকেট পাটের বীজ বিক্রিতে আড়াই টাকা- অর্থাৎ প্রতি প্যাকেটে ৫০ পয়সা করে বেশি নিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলেন এক ব্যক্তি।

১৯৮২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের সামরিক শাসনামলে সেই অনিয়মের ঘটনায় করা মামলায় ওবায়দুল আলমকে দুই মাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ওই আদেশের পর তাকে কারাগারে যেতে হয় এবং চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হয়।

এর প্রায় ৩৯ বছর পর ২০১১ সালে জেনারেল এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর পরই চাকরি ফিরে পেতে হাইকোর্টে রিট করেন ওবায়দুল আলম। ওই রিটের শুনানি নিয়ে সাজার বিষয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

এরপর ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর হাইকোর্টের তাকে সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়াসহ চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনামলের সেই অনিয়মের ঘটনায় ওবায়দুল আলমকে দেওয়া দুই মাসের দণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানার আদেশও অবৈধ ঘোষণা করেন আদালত।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে আপিল করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। গত বছরের ৮ মার্চ আপিল বিভাগ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আপিল খারিজ করেন। এর ফলে ওবায়দুল আলমকে পাট সম্প্রসারণ সহকারী হিসেবে উপযুক্ত বা প্রকৃত পদে সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়াসহ চাকরিতে পুনর্বহালের আদেশও বহাল থাকে।

তবে ১৯৮২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সরকারের সামরিক শাসনামলে সেই দুই মাসের দণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা অবৈধ করে দেওয়া রায় আংশিক সংশোধন করা হয়। সেই রায়ে বলা হয়, ওবায়দুল আলমের সাজা বাতিল হলেও তিনি এ পর্যন্ত দাবি করা বেতন-সুবিধা পাবেন না।

আপিল বিভাগের ওই রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ। সেই রিভিউও সোমবার খারিজ করে দিলেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে আদালাত বলেছে, ওবায়দুল আলমকে তার প্রাপ্য বেতন-সুবিধাও দিতে হবে।

আদালতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ। অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওবায়দুল আলম আকনের পক্ষে শুনানি করেন প্রবীর নিয়োগী।

রায়ের পর উচ্ছ্বসিত ৬৮ বছর বয়সী ওবায়দুল আলম আকন বলেন, ‘আজকে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বেশি আনন্দিত হলে মানুষ ভাষা হারিয়ে ফেলে। আমিও ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমি জীবিত থাকা অবস্থায় এ রায় দেখে যাব এমনটি ভাবতে পারিনি। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া।’সূত্র:কালের কণ্ঠ