খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে নতুন কৌশলে বিএনপি

দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তারপর ২৫ মাসের মধ্যে প্রায় অর্ধেক সময় ছিলেন হাসপাতালে।গতবছর ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনায় সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে গুলশানের বাসায় বসবাস করলেও রাজনীতিতে তার কোনো অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়নি।

যদিও দলের নেতারা দাবি করছেন খালেদা জিয়া এখনও মুক্ত নন। তিনি কারাবন্দি থেকে এখন গৃহবন্দি। কারাবন্দী দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে সংগঠন সুগঠিত করে অচিরেই মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।সোমবার (০৮ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এই ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, ‘‘আমার কারাবন্দি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে, আমরা এতে্াই দুর্ভাগা, এতোই ব্যর্থ যে, আমরা আপনাদেরকে কোনো প্রকার ব্যবস্থা করতে পারি নাই।শুধু একটি কথা বলতে চাই, খালেদা জিয়া সারাজীবন বন্দি থাকবেন এমন কথাও বলছি না। আজকের এই প্রতিবাদ সমাবেশ বা মানববন্ধন প্রমাণ করেছেন- তিলে তিলে এই বন্ধন বড় হবে খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত।

আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, দলকে সুন্দরভাবে সুগঠিত করে ইনশাল্লাহ অচিরেই আমরা মাঠে নামবো, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো এবং তারেক রহমানকে আমরা দেশে ফিরিয়ে আনবো।দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমরা যদি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চাই তাহলে আমাদেরকে যুদ্ধে শামীল হতে হবে, সেই যুদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই হবে। সেই যুদ্ধ শ্লোগানের মধ্য সীমাবদ্ধ না।

সেই যুদ্ধ শুধু আমাদের নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য চেষ্টা না করে দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে খালেদা জিয়াকে বন্দি থেকে মুক্তি করতে হবে।তিনি মুক্ত হলে গণতন্ত্র মুক্তির সূচনা হয়, খালেদদা জিয়া মুক্ত হলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিদেশে মাটিতে থাকতে হয় না। বাংলাদেশের এসে জনগণের নেতৃত্ব দিতে পারে।

সেই কারণে বলছি, বার বার বলছি, সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বার বার বলছি, আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করে কোনোভাবে রাজপথ ছাড়বো না। আমাদের কথায় নয় কাজে প্রমাণ করতে হবে। আমাদের রাজপথ দখলে নিতে হবে এবং সকল পথ-ঘাট আজকে জনগনের দখলে নিতে হবে।

তিনি বলেন, এই দুর্নীতিবাজ, ঠকবাজ, প্রতারক এই সরকারকে ঘর থেকে যাতে বেরুতে না পারে সেই পথ তৈরি করতে হবে। এমনি তারা বাক্সে মধ্যে মিশে আছে।আর ঘরে বসে বসে আবোল-তাবোল প্রতিদিনই তারা কথাই বলছে। অবজ্ঞা-তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মানুষকে অসন্মান করে কথা বলা-এটা তাদের রোগে পরিণত হয়েছে।

‘কারণ জনগণের ভোট যাদের দরকার হয় না, জনগণের সমর্থন যাদের দরকার হয় না তাদের মুখ থেকে এটাই মানানসই কথা। সেই কারণে আজকে যে কারণে জিয়াউর রহমান যুদ্ধ করেছিলো, যে কারণে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এদেশ স্বাধীন করেছিলো একটি গণতান্ত্রিক দেশ দেখার জন্য, সেই গণতান্ত্রিক দেশ জিয়ার সৈনিক হিসেবে, সেই গণতান্ত্রিক দেশ খালেদা জিয়ার অনুসারী হিসে্বে, সেই গণতান্ত্রিক দেশ তারেক রহমানের সহকর্মী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব জনগণের পাশে থেকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে আনা।

গয়েশ্বর বলেন, আজকে নির্বাচন কমিশন সরকারকে খুশি করার জন্য যা ইচ্ছা তাই করছে। আপনারা যখন রাস্তায় বেরিয়েছেন করোনাকে উপেক্ষা করে আসুন এই জীবনকে শান্তিময় করার জন্য, এই জীবনকে অর্থবহ করার জন্য, এদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করার জন্য আমরা যুদ্ধে শামীল হই।

আমাদেরকে যা করলে সরকার ভয় পাবে, সরকার মনে করবে, সময় নাই গণতন্ত্র ফেরত দিতে হবে- সেই কাজটি করতে হবে খালেদা জিয়ার একজন কর্মী হিসেবে।এখন আমাদেরকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নভাবে জনগনের পক্ষে থাকতে হবে এবং রাজপথ দথল করে শেখ হাসিনাকে বিদায় দিতে হবে।

‘আল-জাজিরা প্রতিবেদন মিথ্যা প্রমাণ করুন’কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেল ‘আল-জাজিরা’ বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে মির্জা আব্বাস বলেন, এই বছর হলো আমাদের স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীর বছর।এই সময়ে আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের এবং আমার নেতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, দেশ স্বাধীন করেছি এই কথা শুনার জন্য নয় যে, বাংলাদেশ একটি মাফিয়া দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, এই কথা শুনার জন্য নয় বাংলাদেশ একটা মাফিয়া রাষ্ট্র। এই কথা আমরা আর কখনো শুনতে চাই না।আমরা বলতে চাই এই সরকারকে। আপনারা দয়া করে প্রমাণ করুন আল-জাজিরায় যা কিছু আসছে সব মিথ্যা।আমরা আপনাদের সমর্থন দেবো, আমরা আপনাদের সাহায্য করবো। প্রমাণ করেন। শুধু মুখে ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছে…।

তিনি বলেন, একজন মন্ত্রী আছেন আমি কী বলব নাম, নাম বলতে ঘৃণা লাগে। কি কয়, না কয় তার কোনো হিসাব নাই। কয় এই সমস্ত বাজে কথা। আমরা মামলা করবো।এই প্রসঙ্গ আমার এক বন্ধু খুব খারাপ ভাষায় বলেন আরকি- যে কাজটা করতে পারবেন না, সেটা নিয়ে আর টানাটানি কইরেন না। মামলা করলে মামলা করে দেখান। ঠিক আছে।

কিন্তু এই কথা আমরা শুনতে চাই না স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে যে, বাংলাদেশ মাফিয়া রাষ্ট্র। এটা দূঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক।গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমরা কখনো আল-জাজিরা দেখতে চাই না। আমাদের দেখতে হচেছ কেনো? আল-জাজিরায় যে সমস্ত প্রকাশ করা হয়েছে তা বাংলাদেশের দুর্নীতির এক হাজার ভাগের এক ভাগ। সরকার তার স্বভাবসুলভ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তার প্রতিবাদ জানায়।

তথ্য-প্রমাণ দিয়ে আপনাদেরকে প্রমাণ করতে হবে আল-জাজিরা সঠিক নয়। আল-জাজিরার খবর থেকে জনগন মুক্তি চায়।‘খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় নাই’গুলশানে খালেদা জিয়া গৃহবন্দি উল্লেখ করে গয়েশ্বর বলেন, আজকে খালেদা জিয়া ভাই-বোনদের সাথে দেখা করতে পারে না কেনো, কি কারণে বুঝতে কষ্ট হয়।

করোনার কারণে খালেদা জিয়াকে বাড়িতে রেখেছে। হসপিটালে রাখলে সেই চিকিতসা না দিতে পারলে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় না।বিএনপি এতো বড় একটি দল, এই দলের হাজারো নেতা-কর্মী। কী কারণে খালেদা জিয়া বন্দি থাকবে? আর আমরাই বা কেনো মুক্ত কন্ঠে শুধু আকুতি জানাব, মুক্তির জন্য কিছু করবো না।

আশা করি আমার কথা আপনাদের বুঝতে কষ্ঠ হয় নাই। সকলের এক্ই কথা- খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, গণতন্ত্রের মুক্তি চাই, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।খালেদা জিয়ার কারা্বন্দিত্বের তৃতীয়বর্ষপূর্তিতে সারাদেশে জেলা-মহানগরে প্রতিবাদ সমাবেশের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির হিসেবে বিএনপি দক্ষিন-উত্তরের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এই প্রতিবাদ সমাবেশ হয়।

দুই সিটি করপোরেশনের বি্ভিন্ন ওয়ার্ড-থানাসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী এই সমাবেশে অংশ নেয়। তারা খালেদা জিয়ার ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড হাতে তার মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়।মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে ও দক্ষিনের কাজী আবুল বাশার এবং উত্তরের আবদুল আলীম নকির সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমান,আবদুস সালাম,

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নেতা শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আবদুস সালাম আজাদ, আমিরুজ্জামান খান শিমুল,মহানগর বিএনপির মুন্সি বজলুল বাসিত আনজু, হাবিবুর রশীদ হাবিব, এজিএম শামসুল হক, যুব দলের সাইফুল ইসলাম নিরব, সুলতান সালাহ্উদ্দিন টুকু, এসএম জাহানঙ্গীর, রফিকুল আলম মজনু,

স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল, ফখরুল ইসলাম রবিন, মহিলা দলের হেলেন জেরিন খান, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, শ্রমিক দলের মুস্তাফিজুল করীম মজুমদার, মতস্যজীবী দলের আব্দুর রহিম, ছাত্র দলের ফজলুর রহমান খোকন প্রমূখ নেতারা বক্তব্য রাখেন।

প্রতিবাদ সমাবেশে বিএনপির হাবিবুর রহমান হাবিব, আজিজুল বারী হেলাল, মীর সরাফত আলী সপু, শামীমুর রহমান শামীম, নাজিমউদ্দিন আলম, নিপুণ রায় চৌধুরী,রফিক শিকদার, আবদুল খালেক, রাজীব আহসান, মোরতাজুল করীম বাদরু, মোস্তাফিজুর রহমান, নবী উল্লাহ নবী, ইউনুস মৃধা, কাজী ইফতেখায়রুজ্জামান শিমুলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

dailyinqilab