এমপি নিক্সনের মামলা প্রত্যাহরের দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিল

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরের সদরপুরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র সাংসদ মুজিবর রহমান ওরফে নিক্সন চৌধুরীর পক্ষে মিছিল হয়েছে। তবে নিক্সন বিরোধী আওয়ামী লীগের অন্য অংশকে মাঠে দেখা যায়নি।

শনিবার সকাল ৯টা থেকে পরের দিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার জন্য সদরপুর উপজেলা পরিষদে কমপ্লেক্সে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সদরপুর সরকারি কালেজ এলাকাসহ এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে উপজেলা প্রশাসন।

১০ অক্টোবর চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংসদ নিক্সন চৌধুরী জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোন করে গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নওয়াবুল ইসলাম বাদী হয়ে সাংসদ নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চরভদ্রাসন থানায় একটি মামলা করেন।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৪ সংসদীয় আসন। এ আসনে আগে সাংসদ ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যা। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পরপর দুই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিক্সন চৌধুরী পরাজিত করেন কাজী জাফর উল্যাকে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী জাফর উল্যাকে হারিয়ে নিক্সন চৌধুরী সাংসদ হলে এই তিন উপজেলায় আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে পড়ে।

১০ অক্টোবর চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাউছার হোসেন জাফর উল্যার প্রতি আনুগত্য ছেড়ে নিক্সন শিবিরে যোগ দেন নির্বাচনের ১৫ দিন আগে। ফলে নিক্সনের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে কাউসার নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিজয়ী হন। কিন্তু ওই নির্বাচন চলাকালে কাউসার সমর্থক কয়েকজন এজেন্ট ও কর্মী জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করলে কর্তব্যরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাঁদের বাধা দেন। এটাকে কেন্দ্র করে নিক্সন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ইউএনও জেসমিন সুলতানাকে মুঠোফোনে আপত্তিকর কথা বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় রাত আটটার দিকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর সাংসদ নিক্সন জেলা প্রশাসককে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন।

এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার চরভদ্রাসন থানায় একটি মামলা হয়। মামলা দায়েরের পর তিন উপজেলার আওতাধীন দুই ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এ জাতীয় কর্মসূচি পালন করা হয় ভাঙ্গায়। সমর্থকেরা সাংসদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করেন। অন্যদিকে নিক্সনবিরোধীরা জেলা প্রশাসক ও ইউএনওকে গালাগালি করার প্রতিবাদে বিচার দাবি করে কর্মসূচি পালন করেন।

১৪৪ ধারা জারির আগে সদরপুর উপজেলার কাজী জাফর উল্যা–সমর্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সাত্তার হোসেন ফকির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত বুধবার আমরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করার জন্য ইউএনওর কাছ থেকে অনুমতি নিই। কিন্তু আমাদের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার জন্য নিক্সন চৌধুরীর সমর্থকেরা গত বৃহস্পতিবার পাল্টা কর্মসূচির ডাকে।’ আর নিক্সন–সমর্থক সদরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী শফিকুর রহমান বলেন, ‘সাংসদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলছে।’

সদরপুরের ইউএনও পূরবী গোলদার গণমাধ্যমকে বলেন, দুটি পক্ষের কর্মসূচির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বিবেচনায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করা স্থানের চারপাঁশের সড়কে বেঞ্চ পেতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাশের ভাঙ্গা উপজেলার নূরাল্লাগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহীন আলম সাহাবুলের নেতৃত্বে শতাধিক ব্যক্তির একটি মিছিল সাংসদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সদরপুরে আসে। মিছিলকারীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের রাস্তার অবরোধ ভেঙে উপজেলা পরিষদ চত্বরের দিকে যেতে শুরু করেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে মিছিলটিকে বাধা দেয় পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

সাংসদ নিক্সন–সমর্থিত সদরপুরের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী শফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে শনিবার সকালে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসক ১৪৪ ধারা জারি করায় আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করতে পারিনি।’

নিক্সন বিরোধী কাজী জাফর উল্যা–সমর্থিত অংশের উপজেলা পর্যায়ের নেতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফকির আবদুস সাত্তার বলেন, সাংসদ নিক্সন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে উপজেলা আওয়ামী লীগ সদরপুরে শনিবার সকালে এক বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। কিন্তু প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করায় নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করা হয়নি।

এদিকে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা সদরে সাংসদ নিক্সনের মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার উপজেলা সদর বাজার এলাকায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিছিল করেন নিক্সন সমর্থকেরা। মিছিলে শতাধিক ব্যক্তি অংশ নেন। এতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাহান মোল্লা, সাবেক শ্রমবিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের, চরভদ্রাসন সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি মিজানুর রহমান প্রমুখ অংশ নেন।সূত্র:সময়ের কণ্ঠস্বর