এই তথ্যগুলো জানলে আপনি আর কখনই আলু খাবেন না

শুধু খাওয়ার জন্যই বেঁচে থাকা নয়। বরং সুস্থভাবে বাঁচার জন্য দরকার স্বাস্থ্যকর খাবার এবং একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা। কেউ বলবে না যে আলু একটি অস্বাস্থ্যকর খাবার। পুষ্টিবিজ্ঞানের মতে আলুর পুষ্টি অসংখ্য। আলুতে আছে স্বাস্থ্যকর পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ভাইটামিন বি৬ এবং ভাইটামিন সি, কিন্তু তারপরও অনেকেই আলু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে চান। এর কারণ একটাই, আর সেটা হচ্ছে আলুর গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স (glycemic index), যার মানে হচ্ছে এটা খেলে আপনার ব্লাড সুগার বাড়বে।

আলু রান্না করার পদ্ধতিও এর পুষ্টিগুণ অনেকাংশে পরিবর্তন করতে পারে। একভাবে রান্না করলে আপনি পাবেন অনেক স্বাস্থ্যকর আঁশ যা আপনার কোলেস্টেরল কমাবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং আপনাকে ক্যান্সার থেকে দূরে রাখবে।

কিন্তু অন্য আরেকভাবে আলুর রান্না আপনার মৃত্যু ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই সঠিক উপায়ে আলু রান্না করতে হলে কিছু জিনিষ জানতে হবে। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কি আলু খাবেন নাকি অন্যান্য সবজি খাবেন যাতে আছে আলুর মতই ভাইটামিন, মিনারেল আর আঁশ।

তাই আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এখানে কিছু তথ্য দেয়া হল এবং এই তথ্যগুলি পড়লে আপনি হয়তো ভবিষ্যতে আলু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে চাইবেন, বিশেষ করে ৩ এবং ৬ নম্বরের তথ্যগুলো আপনাকে সত্যিই দোটানায় ফেলতে পারে।

১। আলু খেলে ওজন বাড়েঃ ওজন বৃদ্ধিহার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা আলুর ওপর একটি বিশাল গবেষণা করেন। তাঁরা ১২ বছরের বেশী বয়স্ক, এক লক্ষ বিশ হাজার সুস্থ সবল অংশগ্রহনকারীকে ১২ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যারা অন্যান্যদের তুলনায় বেশী আলু খেয়েছেন তাদের গড় ওজন আধা কেজি বৃদ্ধি পায়।

এই ফলাফল আরো খারাপ দেখায় তাদের ক্ষেত্রে যারা পটেটো চিপ্স ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেয়েছেন। পটেটো চিপ্স ভক্ষনকারীদের ওজন বেড়েছিল ০.৭৭ কেজি এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ভক্ষনকারীদের ওজন বেড়েছিল ১.৫ কেজি।

২। আলুতে আছে অধিবিষঃ আলুর অধিবিষ আলু যখন আলোর সংস্পর্শে আসে তখন এতে গ্লাইকোএলকালয়েড (glycoalkaloids) নামে এক ধরনের উপাদান জন্ম নেয় যা একটি টক্সিন বা অধিবিষ। আলুর ছিলকার নীচে যদি আপনি সবুজ আভা দেখেন বুঝবেন সেগুলি সোলানিন এবং চ্যাকোনিন নামের ক্ষতিকর গ্লাইকোএলকালয়েড। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশতঃ আলুতে সবুজ রঙ না দেখলেও এই টক্সিনগুলি থাকতে পারে। [আরো পড়ুন প্রতিদিন ফ্রাইড চিকেন খেলে অকাল মৃত্যুর সম্ভাবনা ১৩% বাড়তে পারে]

এই গ্লাইকোএলকালয়েডগুলি আপনার পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করতে পারে এবং ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (inflammatory bowel disease) থাকলে তার আরো অবনতি হতে পারে। এছাড়া আপনি তন্দ্রালু হয়ে পড়তে পারেন এবং আপনার শরীরে চুলকানি দেখা দিতে পারে। এই টক্সিনগুলি যাতে জন্মাতে না পারে সেজন্য আলুকে আলো থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করুন। এছাড়া আলু ছিলে খেলে আরো ভাল কারণ এই টক্সিনগুলির ৬০ থেকে ৭০% ভাগ থাকে আলুর ছিলকায়। আবার মনে রাখতে হবে যে আলুর স্বাস্থ্যকর উপাদানের অনেকখানিই থাকে ছিলকাতে।

৩। ভাজা আলু খেলে ক্যান্সার হয়, আমাদের দেশ তথা ভারত উপমহাদেশে আলু খাওয়া হয় সেদ্ধ করে, তারপর ভর্তা বানিয়ে। কিন্তু এছড়াও আমরা এবং সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনগণ আলু খান ভেজে। তবে দুঃসংবাদ হচ্ছে আলু ভাজলে এতে এক্রিলামাইড (acrylamide) নামে এক ধরনের কেমিক্যাল উৎপন্ন হয়।

এই কেমিক্যালটি এক ধরনের ক্ষতিকারক কার্সিনোজেন। এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যারা সপ্তাহে দু’বারের বেশী ভাজা আলু খান তাঁদের যে কোন রোগে অকাল মৃত্যুর সম্ভাবনা অন্যান্যদের তুলনায় দ্বিগুণ।

৪। আলু খেলে ব্লাড সুগার বেড়ে যায়,আলুর গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স (glycemic index) অনেক বেশী। গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স হচ্ছে শর্করা জাতীয় খাদ্য কত দ্রুত রক্তের চিনি বাড়ায় তা নির্ণয়ের একটি পরিমাপ। বিশজ্ঞরা বলেন আপনার উচিৎ আলু খাওয়া কমানো কারণ এটা খুব দ্রুত হজম হয় যার ফলে ব্লাড সুগার এবং ইন্সুলিন বেড়ে যায়। আবার খুব দ্রুত এগুলির মাত্রা কমে গিয়ে ক্ষুধার উদ্রেক হয়।

এর ফলে আপনি খাবার বেশী খেয়ে আপনার ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং স্থূলতার সম্ভাবনা বাড়াবেন। এই সমস্যা থেকে দূরে থাকতে আপনার আলু খাওয়া উচিৎ অল্প চর্বিযুক্ত আমিষ জাতীয় খাদ্যের সাথে। এটা আপনার রক্তে চিনি নির্গমণ নিয়ন্ত্রণ করবে। আরেকটা উপায় হচ্ছে ভাজার পর আলু ঠান্ডা করে খাওয়া; এতে করে আলুতে কিছু সহ্যকারী আঁশ উৎপন্ন হবে যা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখবে

৫। আলু খাওয়া শুরু করলে তা থামানো কঠিন, আপনি যদি আলু খাওয়া শুরু করেন দেখবেন অল্প সময়ের মধ্যেই আপনি অনেক বেশী পরিমানে আলু খেয়ে ফেলেছেন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর পটেটো চিপ্স খুবই আসক্তি-সৃষ্টিকারী এবং আলু খুব সহজেই হজম হয় যার ফলে খুব বেশী পরিমাণে খাওয়া হয়ে পড়ে।

বিশজ্ঞদের মতে ম্যাশড পটেটো আধ কাপের বেশী এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ২-৩ আউন্সের বেশী খাওয়া উচিৎ নয়। কিন্তু এই মজাদার খাদ্যগুলি খাওয়া শুরু করলে কারই বা মনে থাকে কতটুকু খাওয়া উচিৎ? তবে একটা জিনিষ মনে রাখতে হবে যে খাবার সময় আলুর পরিমাণ প্লেটের খাদ্যের ৪ ভাগের ১ ভাগের বেশী না হয়।

৬। আলুতে থাকে প্রচুর কীটনাশক, বিশ্বের সর্বত্র আলু ফলনের সময় কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে সেদেশে আলুতে ৩৫ ধরনের বিভিন্ন কীটনাশক পাওয়া গেছে এবং এগুলির মধ্যে ৬টিই খুব ক্ষতিকর।

আলু ফলনের সময় বিভিন্ন সময়ে এতে কীটনাশক স্প্রে করা হয় – বেড়ে উঠার সময়, ফসল উঠানোর সময় এবং উঠানোর পরে। যেহেতু আলু একটি কন্দজাতীয় শস্য তাই এটা সব ধরনের কীটনাশক খুব সহজেই শুষে নেয়। কিন্তু ধুয়ে এই কীটনাশক সরানো যায় না।

৭। আলুর কিছু অংশ বিষাক্ত, মনে রাখবেন আলু গাছের পাতা এবং দন্ড খুবই বিষাক্ত। যদিও আমরা আলুর এই অংশগুলো খাই না, তারপরও এটা একটা দুঃসংবাদ। [আরো পড়ুন একা খাওয়া আপনার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে]

আলুর চোখ এবং অঙ্কুরও খুব বিষাক্ত। মনে রাখবেন আলু খাবার সময় অবশ্যই আপনাকে আলুর এই চোখ এবং অঙ্কুর (যদি থাকে) ফেলে নিতে হবে।

৮। আলু খেলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগহ্যাম এন্ড উইমেন্স হসপিটাল এবং হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের বিজ্ঞানীদের মতে সপ্তাহে ৪ বা তার বেশী সার্ভিং সেদ্ধ, ম্যাষ করা বা বেইক করা আলু খেলে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবণা বৃদ্ধি পায়। তাঁরা গবেষণাটি ১৮৭,৪৫৩ জন মার্কিন নাগরিকের উপর ২০ বছর ধরে চালিয়েছিলেন।

আরো গবেষণার পর দেখা যায় যে যদি সপ্তাহে এক সার্ভিং আলুর পরিবর্তে অন্য ধরনের সবজি খাওয়া হয় তাহলে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার এই সম্ভাবণা অনেকাংশে কমবে। এছাড়া গবেষণায় আরো দেখা যায় যে বেশী বেশী ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেলে তা পুরুষ ও নারী, উভয়ের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবণা বাড়ায়।

পরিশেষে, আলু আসলে খুব স্বাস্থ্যকর যদি আপনি খুব মনোযোগ সহকারে এটা খাওয়ার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখেন, সঠিকভাবে রান্না করেন এবং শুধু অর্গানিক আলু খান। আপনি যদি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে চান তাহলে অন্যান্য অনেক খাবার আছে যা খেতে এত গবেষণার প্রয়োজন নেই।

গবেষণায় দেখা গেছে আপনি যদি আপনার খাদ্যাভ্যাস একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চান তাহলে আপনার পরাজয়ের সম্ভাবনাই বেশী। তাই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে চাইলে তা করা উচিৎ ধীরে ধীরে। আর সেটা আপনি শুরু করতে পারেন আলু খাওয়া কমিয়ে বা তা বর্জন করে।