বরিশালের সন্তান মাসুদ কক্সবাজারে প্রদীপ জ্বালিয়ে কোটিপতি

পুলিশ-প্রশাসনে এবিএম মাসুদ হোসেন নামেই পরিচিত ক’ক্সবাজারের এসপি। কিন্তু নিজ এলাকা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের পড়শীদের কাছে তিনি মিন্টু নামে পরিচিত এবং একজন সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সমীয় আদায় করে চলতেন। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের হ’ত্যাকা’ন্ডের পর এসপি মাসুদের সরল চে’হারার আড়ালে অ’ন্ধকার আরেকটি জগত রয়েছে তা বেড়িয়ে আসায় তার নিজ এলাকার মানুষই এখন বি’স্মিত।

শিক্ষিত ঘরোনার সন্তান এবিএম মাসদ ওরফে মিন্টু এক সময় ঢাকার একটি প্লট কিনতে আ’র্থিক দৈ’ন্যতায় বন্ধুদের সহায়তা চেয়েছিল। সেই এবিএম মাসুদ কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গত ২ বছরে হয়েছেন কোটিপতি। শোনা যায় শুধু ঢাকায় নয়, মালয়েশিয়াতেও স্ত্রীর নামে অ’ট্টালিকা রয়েছে।

বিভিন্ন গো’য়েন্দা সং’স্থার প্রতিবেদন এসব তথ্য উঠে এসেছে যা গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্র’কৃতঅর্থেই প্রদীপের ন্যায় জ্বা’লিয়ে নিজে অ’ন্ধকারে থেকে এই বিপুল অ’র্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং নীতি নৈতিকতা জ’লাঞ্জ’লি দিয়েছেন।

গত দুদিন ধরে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে ঘুরে প্রায়াত স্কুল শিক্ষক আব্দুল কাদের হাওলাদারের পুত্র এবিএম মাসুদ স’ম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তাতে এলাকায় তার য’থেষ্ট সুনাম রয়েছে একজন সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে।

বছরে দুই একবার ঈদ উৎসবে এলাকায় আসলে তার চলন-বলন এতটায় স্বাভাবিক ছিল যে, তিনি কক্সবাজারের দা’পুটে এসপি এবং অল্প বয়সে স্বল্প সময়ে অগাত অ’র্থের মালিক হয়েছেন তা স্থা’নীয়রা বিশ্বাস আনতে পারছেন না। নি’শ্চিত হওয়া গেছে, মাসুদের গোটা পরিবারই আওয়ামী লীগ স’মর্থিত। তার বাবা গোবিন্দপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং দলের জন্য ছিলেন নিবেদিত।

মেঘনা নদী ভা’ঙনের পর গোবি’ন্দপুর ইউনিয়ন বি’ভক্ত হয়ে এপারে দক্ষিণ উলানিয়ার রাজাপুরে নতুন বসতি গড়ে তোলা আব্দুল কাদের হাওলাদার ও অজুফা খাতুন দম্পতির পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা স’ন্তানের মধ্যে বড় সন্তান তথ্য ম’ন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। মেঝো পুত্র টেক্সাটাইল ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন ঢাকায়। অপর দুই ভাইয়ের একজন গোবিন্দপুর ইউনিয়নের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আরেক ভাই একই উপজেলার পাতারহাটে শিক্ষকতা করেন। তার এক কন্যা স’ন্তানও শিক্ষিকা হিসেবে গ্রামে খুব সুনামের সহিত রয়েছেন।

কিন্তু তৃতীয় পুত্র এবিএম মাসুদ ওরফে মিন্টুর কিভাবে উ’ত্থ্যান সে স’ম্পর্কে এলাকাবাসী স’ম্মুখ ধারনা নেই। মে’হেন্দিগ’ঞ্জের উত্তর শাহাবাজ জজ ইনস্টিটিউট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পরই তিনি ঢাকায় ওঠেন। বিসিএস ক্যা’ডার ভাইয়ের বাসায় থেকে রাজধানীর লক্ষীবাজা’রস্থ সরকারি শ’হীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ পর্যন্ত তিনি কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না।

তবে চাকুরি নেওয়ার সু’বিদার্থে গত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আমলে ইসলামি ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের অন্যতম একজন সদস্য যিনি কিনা কেন্দ্রীয় জা’মায়াত নেতা হিসেবে পরিচিত তার বাসায় যাতায়াত শুরু করেন। একপর্যায়ে ইসলামী ব্যাংকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কা’র্যালয়ে উ’র্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরি পান।

সেখানে চাকুরি করার সুবাদে জা’মায়াত নেতাদের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে এবং দলটির আদর্শিক ধারা নিজের ভিতর পো’ষণ করে চলতেন। সেই জোট সরকারের আমলে ২৪তম বিসিএসে শিক্ষানবিশ এএসপি হিসেবে তিনি পুলিশ প্রশাসনে যোগদান করেন। পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (টিআর) পদে দায়িত্ব পালনকালীন ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাসুদ পুলিশ সুপার পদে প’দোন্নতি পান।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষ’মতায় আসার পর এবিএম মাসুদ তার শ্ব’শুড় বরিশাল আওয়ামী লীগের পরিচিত মুখ সদ্য প্রায়াত আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন কাবুলের মাধ্যমে ঢাকায় কেন্দ্রীয় হা’ইকমা’ন্ডের অনেক নেতার সাথে সু-স’ম্পর্ক গড়ে তোলায় অতীতের জা’মায়াত কানেকশনের বিষয়টি নিয়ে কেউ আর ঘা’টাঘাটি করেননি। এমনকি সরকারের উ’চ্চপর্যায়েও মাসুদের বিষয়ে নীরব ছিল।

বরিশাল আদালতের পাবলিক প্র’সিকিউটর অর্থাৎ পিপি হিসেবে কর্মরত থাকা অ’বস্থায় তার শ্বশুড় গত বছরের ১৯ এপ্রিল ই’ন্তেকাল করেন। প্রায়াত আওয়ামী লীগ নেতা কাবুলের দুই কন্যা সন্তানের মধ্যে জেষ্ঠ্য জেনিফার মুনকে ইসলামী ব্যাংকে চাকুরি পাওয়ার পরই বিবাহ করেন এবিএম মাসুদ ওরফে মিন্টু। বরিশালের শ্ব’শুড়ালয়েও জামাতাকে মিন্টু হিসেবে নাম স’ম্মোধন করা হতো বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। শ্বশুড়ের মৃ’ত্যুর পর এবিএম মাসুদের শ’ক্তি কিছুটা খ’র্ব হয়। কিন্তু শ্বশুড় কা’বুলের মৃ’ত্যু পূর্বে একদিকে শ্বশুড়ালয়ের শ’ক্তি অন্যদিকে ভাই একজন সচিবালয়ে থাকায় মি’ন্টুকে পুলিশ প্রশাসনে শ’ক্ত অ’বস্থান গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।

অবশ্য সেই সাথে তার সততার গুনেই ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এবিএম মাসুদ হোসেন দেশের গু’রুত্বপূর্ণ জেলা কক্সবাজার, যা পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সোনার হরিণ পাওয়ার মতো জায়গা, সেখানকার পুলিশ সুপার হিসেবে তিনি যোগদান করেন। এর পূর্বে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই সৎ পুলিশ কর্মকর্তা অ’সৎ পথে পা বাড়ান প্রদীপের আলোতে। একাধিক গো’য়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে তথ্য প্র’কাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় শুধু টেকনাফ নয় গোটা কক্সবাজারের ৮টি থানার ভা’রপ্রাপ্ত ক’র্মকর্তারা এই এসপিকে ম্যা’নেজ করে অ’নৈতিক ক’র্মকান্ডের মাধ্যমে আ’র্থিক শ’ক্তভিত তৈরির এক স্ব’র্ণযুগ তৈরি করেন গত দুই বছরে। সেক্ষেত্রে ই’য়াবা ও অ’স্ত্র পা’চার ব’ন্ধের নামে শুরু হয় পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে অ’নৈকিতার এক ধরনের প্র’তিযোগীতা।

টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ হয়ে ওঠেন তার আলাদিনের চে’রাগের ন্যায়। এই প্রদীপের ক’ল্যানেই এসপি মাসুদের মা’সিক উ’পার্জন ছিল একজন শিল্পপতির চেয়েও কয়েকগুন বেশি। বে’পরোয়া হয়ে ওঠে শুধু প্র’দীপ নয়, উখিয়া ও রামু থানার ভা’রপ্রাপ্ত ক’র্মকর্তাও। এই তিন কর্মকর্তা ক্র’সফা’য়ার আ’তঙ্ক সৃ’ষ্টি করে কোটি কোটি টাকা আদায় করতেন বিভিন্ন ব্য’ক্তিকে টা’র্গেট করে। এক পর্যা’লোচনায় দেখা যায়, এসপি এবিএম মাসুদের আ’মলেই কক্সবাজারে প্রায় ৩ শতাধিক ক্র’সফায়া’রের ঘ’টনা ঘটে। এর মধ্যে প্রদীপ একাই ২৮৭টি বি’চার ব’র্হিভূত হ’ত্যাকা’ন্ডের নায়ক হিসেবে রা’ষ্ট্রপতি পদ’কও লুফে নেন। এমন ঘ’টনাও ঘ’টেছে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ ক্র’সফা’য়ারের নে’শায় এতটাই উ’ন্মাত ছিলেন যে, কাউকে গু’লি করে হ’ত্যা করতে না পারলে কুকুর মেরে নে’শার ঘোর কা’টান। আবার কাউকে ক্র’সফা’য়ারে অপর থানার ওসিকে ম্যানেজ করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মর্জিনাকেও সঙ্গী করে বিভিন্ন ক্র’সফা’য়ার নাটক সাজানোর অ’ভিযোগ রয়েছে।

BarishalTimes