আরাফার দিনের সুমহান মর্যাদা ও আমলসমূহ

(১) আরাফার দিনের রোজা দ্বারা দুই বছরের গু’নাহ ক্ষ’মা করা হয়:নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তিনি এর দ্বারা বিগত বছর ও আগামী এক বছরের গু’নাহ মাফ করে দিবেন।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ১১৬২] তবে, আরাফার মাঠে অবস্থানকারী হাজিগণ রোজা রাখবেন না। নবিজি রাখেননি, বরং দুধ পান করেছেন ম’র্মে হাদিস আছে। [মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৫১]

(২) এদিন সর্বাধিক পরিমাণ জা’হান্নামিকে মু’ক্তি দেওয়া হয়:রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘অন্যান্য দিনের তুলনায় আরাফার দিনে আল্লাহ্ তা‘আলা বান্দাকে সবচেয়ে বেশি জা’হান্নাম থেকে মু’ক্তি দিয়ে থাকেন।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৩৫৪, নাসাঈ, আস-সুনান: ৩০০৩]

(৩) আরাফাবাসীকে নিয়ে আল্লাহ্ গর্ব করেন:রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আরাফায় অব’স্থানকারীদের নিয়ে আকাশবাসীর সাথে গর্ব করেন। তিনি তাদের বলেন, ‘‘আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখো, তারা আমার কাছে এসেছে উ’শকোখুশ’কো ও ধূ’লিমলিন অবস্থায়।’ ’’ [আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২/২২৪, হাদিসটি সহিহ]

(৪) আরাফাহ দিবসের দু‘আ ম’র্যাদাপূর্ণ:রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘সর্বোত্তম দু‘আ হলো আরাফার দিনের দু‘আ। আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবিগণ এদিনে উত্তম যে দু‘আটি পড়েছি, তা হলো—

لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللّٰهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ

[মোটামুটি উচ্চারণ: লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহূ লা শারীকা লাহূ লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর]

অর্থ: আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো সার্বভৌম সত্তা নেই। তিনি এক; তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা ও রাজত্ব; তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’’ [তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৫৮৫, হাদিসটি হাসান]

(৫) আরাফায় আল্লাহ্ মানুষের কাছ থেকে তাঁর রবুবিয়্যাত তথা প্র’ভুত্বের স্বী’কৃতি নিয়েছিলেন:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ নামান তথা আরাফার ময়দানে আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে এই প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’, আমরা সকল মানুষ সেদিন বলেছিলাম, ‘নিশ্চয়ই হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।’ [সূরা আ’রাফ, আয়াত: ১৭২, আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদিসটি সহিহ]

(৬) আরাফার দিনেই আমাদের দীন তথা ইসলামকে পূর্ণতা দেওয়া হয়েছিলো:একবার ইহুদিরা উমর (রা.)-কে বললো, তোমরা কুরআনের এমন একটা আয়াত তিলাওয়াত করো, যদি সে আয়াতটা আমাদের মাঝে অবতীর্ণ হতো, তবে, আমরা সেদিনকে ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করতাম। উমার (রা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি জানি সে আয়াত কোনটি এবং তা কখন কোথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াম সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। সেদিন হচ্ছে আরাফার দিন; আল্লাহর শপথ! আমরা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আরাফাতেই ছিলাম। সে আয়াত হচ্ছে, ‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে প’রিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পূর্ণ করলাম এবং আমি তোমাদের জন্য ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।’’ ’ [সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত: ০৪, সহিহ বুখারি]

(৭) এ দিনেই বিদায় হজ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো:জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লাম আরাফার ময়দানে উপস্থিত হলেন। যখন সূর্য ঢলে পড়লো, কাসওয়াতে আরোহণ করে বাতনে ওয়াদিতে আসলেন এবং মানুষের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ২১৩৭]

(৮) এই দিনটিও ঈদের মতই আনন্দের দিন:রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘আরাফার দিন, কুরবানির দিন এবং তাশরিকের দিনগুলো হলো ইসলামে আমাদের ঈদের দিন।’’ [আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৪২১]

(৯) এদিন এবং এর পরবর্তী আরও ৪ দিনের অন্যতম কাজ হলো, বেশি বেশি তাকবির পাঠ করা; এটি ওয়াজিব:
.
একটি সুন্নাহসম্মত তাকবির:

اَللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَاللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ وَلِلّٰهِ الْحَمْد

আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

এটি ইবনু মাস‘ঊদ (রা.) ও অন্যান্য পূর্বসূরিদের থেকে প্রমাণিত। [আলবানি, ইরওয়াউল গালিল: ৩/১২৫]

আরাফার দিন অর্থাৎ যুল হিজ্জাহর ৯ তারিখ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একাকী বা জামাতে নামাজ আদায়কারী, নারী অথবা পুরুষ,—প্রত্যেকের জন্য একবার তাকবিরে তাশরিক (উপরে বর্ণিত তাকবিরটি) পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষরা উচ্চ আওয়াজে বলবে, তবে নারীরা নিচু আওয়াজে বলবে। [ফাতাওয়া শামি: ৩/৬১]

(১০) যাবতীয় নেক আমলই আরাফার দিনে করা যায়, কারণ এটি যুল হি’জ্জাহর মহান দশকের অন্তর্ভুক্ত:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলার নিকট যুল হিজ্জাহর (প্রথম) দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও প্রিয় অন্য কোনো আমল নেই।’’ সাহাবাগণ বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়?’ তিনি বললেন, ‘‘না। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান ও মাল নিয়ে (জিহাদে) ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং এর কোনোটি নিয়েই আর ফিরে এলো না (অর্থাৎ, শহিদ হয়ে গেলো, তার কথা ভিন্ন)।’’ [বুখারি, আস-সহিহ: ৯৬৯, আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৬৫০৫, আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৪৩৮]

(১১) শয়তানের জন্য এই দিনটি বিষাদময়। সে এই দিনে নিজেকে তুচ্ছ ও অপদস্থ মনে করে এবং রাগান্বিত অবস্থায় থাকে। কারণ এ দিনে আল্লাহ্ মাগফিরাতের ঝর্ণাধারা বইয়ে দেন তাঁর বান্দাদের জন্য। [মালিক, আল-মুয়াত্তা]

(১২) এই দিনের কসম খেয়েছেন আল্লাহ্:

আল্লাহ্ বলেন, ‘‘আর কসম সেই দিবসের, যে উপস্থিত হয় ও যাতে উপস্থিত হয়।’’ [সূরা বুরুজ, আয়াত: ০৩]

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “প্রতি’শ্রুত দিন হলো, কিয়ামতের দিন; উপস্থিত হওয়ার দিন হলো, আরাফার দিন এবং উপস্থিতের দিন হলো, জুমু‘আর দিন।” [তিরমিযি, আস-সুনান; হাদিসটি হাসান