ইসলামে সাক্ষ্য প্রদানের গুরুত্ব ও মিথ্যা সাক্ষীর শাস্তি

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষের পক্ষ্যে অসম্ভব।
সমষ্টিগত জীবনে পরস্পর ঝগড়াঝাটি হয়। আবার নফসের তাড়নায় মানুষ অনেক অন্যায় কাজ করে বসে। এগুলোর সমাধানে আদালতের স্বরণাপন্ন হয়। প্রত্যেক বিচারপ্রার্থীর কামনা থাকে, ন্যায্য বিচার পাওয়ার।

বিচারে শাস্তি পেয়ে অন্যায়কারী যেন অন্যায়ের পথ থেকে ফিরে আসে। তাই দেশের বিচারব্যবস্থা মানুষের ভরসা স্থল। তা থেকে আস্থা উঠে গেলে সামাজিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামাজিক ব্যাধিগুলো দ্রুতই বিস্তার লাভ করে। সমাজ হয়ে পড়ে অবাসযোগ্য। এ জন্য বলা যায়, সুষ্ঠু বিচার, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা রক্ষার প্রহরী। আর সুষ্ঠু বিচারের প্রথম বুনিয়াদ হলো সাক্ষ্য-প্রমাণ।

বর্তমান সমাজে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ঘাটতি অনেক। এ কারণে, অন্যান্য সামাজিক ব্যাধিগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষ্য জালিয়াতির বিষয়টিও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এমনও শুনা যায়, সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াকে কেউ কেউ পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই সাক্ষ্য জালিয়াতির ফাঁদে পড়ে অনেক নিরীহ মানুষের জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে। আবার গুরুতর অপরাধ করেও কেউ বেকসুর খালাস পায়।

এই সামাজিক অবক্ষয়ের বড় একটি কারণ হলো, আমরা এখন ইসলামের শিক্ষাকে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত এই কয়টির মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। তাই অনেকে অধর্মকে ধর্ম মনে করে কুসংস্কারের জালে আটকা পড়ছি। অন্যদিকে আবার গুরুতর কোনো শরয়ী বিষয়ের প্রতি আমার ভ্রুক্ষেপ করছি না। কেননা, আমরা মনে করি এগুলো জাগতিক বিষয়; এগুলোতে আবার ধর্ম কিসের? এমনি একটি বিষয় হলো সাক্ষ্য জালিয়াতি।

সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী হও!

ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। যদিও তা নিজের, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের বিপক্ষে যায়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُونُواْ قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاء لِلّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقَيرًا فَاللّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلاَ تَتَّبِعُواْ الْهَوَى أَن تَعْدِلُواْ وَإِن تَلْوُواْ أَوْ تُعْرِضُواْ فَإِنَّ اللّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا

‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।’ (সূরা নিসা-১৩৫)

সূরা মায়েদার ৮নং আয়াতে আল্লাহ তায়ারা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُونُواْ قَوَّامِينَ لِلّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ وَلاَ يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلاَّ تَعْدِلُواْ اعْدِلُواْ هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াতে: ৮)

উত্তম সাক্ষ্য দাতার আলোচনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ সর্বোত্তম সাক্ষ্যদাতা কে, আমি কি তা তোমাদেরকে অবহিত করবো? সে ওই সাক্ষ্যদাতা, যে তলব করার আগেই (নিজ দায়িত্ববোধ থেকে) সাক্ষ্য প্রদান করে।’ (সহীহ মুসলিম-৪৪৫৮)

প্রয়োজনের সময় সাক্ষ্য না দিয়ে তা গোপন করা গুনাহের অন্তর্ভূক্ত।

সূরা বাকারার ২৮৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, যে ব্যক্তি তা গোপন করে নিশ্চয় তার অন্তর পাপী। আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্বন্ধে সম্যক অবগত।’

সাক্ষ্য জালিয়াতি গুরুতর অন্যায়:

সাক্ষ্য জালিয়াতি ইসলামে একটি গুরুতর অন্যায় ও অপরাধমূলক কাজ। কারণ, মহান আল্লাহ তায়ালা আল পবিত্র কোরআনে শিরকের সঙ্গে এই বিষটিরও আলোচনা করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতএব তোমরা মূর্তিসমূহের ইবাদত থেকে বেঁচে থাক এবং বেঁচে থাক মিথ্যা সাক্ষ্য হতে।’ (সূরাহজ্জ, আয়াত-৩০)

সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এই আয়াতের ব্যাখ্যা এসেছে যে, হজরত আবু বকরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) একদিন তিনবার এই কথা বললেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করবো না? সাহাবা (রা.) বললের অবশ্যই বলুন হে আল্লাহর রাসূল! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলতে শুরু করলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে শিরক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, এরপর হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে বসলেন এবং বলতে লাগলেন সাবধান! সাবধান! মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। বর্ণনায় এসেছে এভাবে এ বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বলছেন। আর কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, এ কথাটি রাসূল (সা.) এতবেশি বলছিলেন যে, এক পর্যায়ে আমরা বলতে লাগলাম হায়! তিনি যদি চুপ করতেন।’ (সহীহ বুখারী- ২৬৫৩)

প্রখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ব্যাখ্যাগ্রন্ত্রে এই হাদীসের আলোচনায় লিখেন, ‘হাদীসের শব্দ ‘হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে বসলেন’ দ্বারা বুঝা যায়, রাসূল (সা.) বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যথায় তিনি হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে বসতেন না। গুরুত্বের কারণ হলো, বুঝ-বুদ্ধির ভারসাম্য থাকলে মানুষ নিজ থেকেই শিরক থেকে দুরে থাকে। সৃষ্টিগতভাবে মানব চরিত্র হলো, পিতা-মাতার অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। কিন্তু মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি সমাজে হালকাভাবে নেওয়া হয়। কাজেই সমাজে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। এরও কারণ আছে। মিথ্যা কথা, মিথ্যা সাক্ষ্য উপকরণ ও এর ওপর উদ্বুদ্ধকারী বিষয় অনেক বেশি। যেমন লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি কারণে মানুষ বিথ্যা সাক্ষ্য দিতে উদ্বুদ্ধ হয়। এই হাদীসের অর্থ কখনো এটা নয় যে, তার ভয়াবহতা শিরকের চেয়ে বেশি।’ (ফাতহুল বারী শরহু সহীহিল বুখারী, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩১১, প্রকাশনি: মাকতাবাতুস সফা)

পবিত্র আল কোরআনে মু’মিনের পরিচয়ই দেওয়া হয়েছে যে, মুমিন কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর (মুমিন তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন খেল-তামাশার নিকট দিয়ে যায়, তখন ভদ্রভাবে চলে যায়।’ (সূরা: ফুরক্বান, আয়াত: ৭২)

পবিত্র আল কোরআনে সকল অন্যায় কাজে সহযোগিতা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর মিথ্যা সাক্ষ্য দ্বারাও যেহেতু এক পক্ষকে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হয়, তাই তাও নিষিদ্ধের অর্ন্তভূক্ত। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘আর তোমরা সৎকর্ম ও পরহেজগারীতে পরস্পরকে সাহায্য করো, পাপ কাজ ও জুলুম-অত্যাচারে একে অপরকে সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াত: ২)

সহীহ বুখারীর এক হাদীসে এসেছে, মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার কোনো নেক আমলই কবুল হবে না। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান ও সে অনুযায়ী আমল না ছাড়ে, আল্লাহর কাছে তার খাবার, পানীয় থেকে বিরত থাকার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।’ (সহীহ: বুখারী, আয়াত: ১৯০৩) উক্ত হাদীসটিতে যদিও রোজাদারের ব্যাপারে বলা হয়েছে। কিন্তু এর শিক্ষা সকল আমলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

সাক্ষ্য জালিয়াতির কারণ:

প্রসিদ্ধ তাফসির গ্রন্ত্র ‘মা’আরেফুল কোরআন’ এর লেখক মূফতী শফী (রহ.) লিখেন, ন্যায় ও ইনসাফের বিপক্ষে সাক্ষ্যদানের সাধারণত দুইটি কারণ হতে পারে।

(১) আত্মীয়তা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বা কারো প্রতি প্রেম-ভালোবাসা। এ সম্পর্কগুলো সাক্ষ্যদাতাকে তাদের পক্ষ্যে সাক্ষ্য দিতে উদ্বুদ্ধ করে। তারা মনে করে, আমার মিথ্যা সাক্ষ্য দ্বারা তারা যদি ক্ষতি থেকে বাঁচতে বা উদ্দিষ্ট বস্তুটি লাভ করতে পারে তাহলে আমার দুই একটি মিথ্যা কথা বলতে সমস্যা কোথায়।

(২) কারো প্রতি শত্রুতা বা হিংসা-বিদ্বেষ, সাক্ষীকে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে উদ্বুদ্ধ করে। মোটকথা, কারো প্রতি মহব্বত বা দুশমনি, দুইটি এমন কারণ, যা মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে মিথ্যা ও অন্যায়ের পথে নিয়ে যায়।

মহাগ্রন্হ পবিত্র আল কোরআনে মহান রাব্বুল আলামিন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ্যে সাক্ষ্যদানের প্রতিবন্ধক এই দুই কারণকে সূরা নিসার ১৩৫ নং আয়াত নাজিল করে সমূলে উৎখাত করেছে। এরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদানকারী হয়ে যাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা (তোমাদের) পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে হয়।’

আর সূরা মায়েদার ৮ নং আয়াত নাজিল করে ন্যায়ের পক্ষ্যে সাক্ষ্যদানের ওপর প্রতিবন্ধকতা ‘শত্রুতাকে’ দূর করেছেন। তিনি বলেন, ‘ ইনসাফের সঙ্গে সাক্ষ্য প্রদানকারী হয়ে যাও। আর কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো, এ-ই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী; (মাআরেফুল কুরআন, খন্ড-২. পৃষ্ঠা-৫৭৬)

সাক্ষ্য জালিয়াতির ভিত্তিতে রায়:

সাক্ষ্যের জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও সেই সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায় দেওয়া অনেক বড় অন্যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল। প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহীহ মুসলিম-১৮২৯)

অন্য হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিচারকদের তিন ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ জান্নাতে যাবে আর দুই ভাগ যাবে জাহান্নামে। জান্নাতে যাবে ওই সকল বিচারক যারা সত্য জেনে সে অনুযায়ী রায় দেন। বাকি দুই ভাগের প্রথম ভাগ হলো, যারা সত্য জেনেও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়। আরেক দল হলো, ওই সকল বিচারক যারা আইন-কানুন না জেনে বিচার করে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৭৩)

মিথ্যা সাক্ষের কয়েকটি ক্ষতি:

(ক) সমাজে মিথ্যা বলার প্রবণতা তৈরি হয়।

(খ) যার বিপক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য তার ওপর জুলুম । মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণে নিরীহ মানুষের মান-সম্মান, জান-মালের ক্ষতি হয়।

(গ) যার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া হয় তার ওপরও জুলুম করা হয়। কারণ, এর দ্বারা দুনিয়াবী ফায়দা হলেও চিরস্থায়ী আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেন, ‘অন্যায়ভাবে কারো জন্য অন্যের মালের রায় দেওয়া হলে সে যেন তা না নেয়। কেননা, এর মাধ্যমে মূলত তার জন্য জাহান্নামের একটি অংশের ফায়সালা করা হয়েছে। এর ফলে- (১) সমাজে ন্যায় ও ইনসাফের গুরুত্ব হ্রাস পায়। অপরাধীরা অন্যায় করার ব্যাপারে আশকারা পায়। (২) সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্তম্বগুলো ভেঙ্গে পড়ে। (৩) পরস্পর হিংসা-বিদ্ধেষ,হানাহানি বৃদ্ধি পায়।

সাক্ষের জালিয়াতি কি?

‘সাক্ষ্য বলা হয়, দেখা বিষয়ের সংবাদ দেওয়া।’ আরবি ভাষার প্রসিদ্ধ অভিধান ‘আল মুজামুল ওয়াসিতে সাক্ষ্যের পরিচয় এভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ‘সাক্ষ্য: প্রত্যক্ষ দেখা কোনো বিষয়ের সংবাদ আদালতে প্রদান করা।’ (মুখতাসারুল কুদূরী, পৃষ্ঠা: ৬৫৬, প্রকাশনি: মাকতাবাতুল হেরা)

প্রখ্যাত ফিকহ্বেত্তা আল্লামা শামী (রাহ.) বলেন, ‘সাক্ষ্য প্রত্যক্ষ দেখা কেনো বিষয়ের সংবাদ দেওয়া; অনুমান ও আন্দাজ নির্ভর না হওয়া। (রদ্দুল মুহতার, খন্ড: ১১, পৃষ্ঠা:৭৮)

অতএব সাক্ষ্যের জালিয়াতি হলো, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য, যে বিষয়ে যতটুকু জ্ঞান থাকা দরকার তার চেয়ে কম থাকা সত্বেও সাক্ষ্য দেওয়া। পবিত্র আল কোরআনে বলা হয়েছে ‘তোমার যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তা আলোচনার পেছনে লেগো না। কেননা, কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা: ইসরা, আয়াত: ৩৬)

প্রকৃত মুমিন কখনো মিথ্যা সাক্ষ্যে দিতে পারে না। আমরা তো নিজেদেরকে মুমিন বলে দাবি করি, কিন্তু ‘ঈমানের হাকীকত বলতে কিছু নেই আমাদের মাঝে। তাই আমাদের দ্বারা গুরুতর অন্যায়ও অতি সহজে হয়ে যায়। এই অবস্থা প্রত্যক্ষ করেই হয়তো কাজী নজরুল বলেছিলেন, ‘ঈমান ঈমান কর, ঈমান কি এত সোজা, ঈমানদার হয়ে কেউ বহে শয়তানি বোঝা?’

আল্লামা ইকবালের কথাতেও এই চিত্র ফুটে উঠে। তিনি বলেন, ‘গুফতার কা কেরদার কা আমল কা মুমিন- দুন্ড ক্যার নেহি মিলতা কোরআন কা মুমিন’ অর্থাৎ আজ কত রকম মুসলমান সমাজে বসবাস করে। কারো থেকে কথার ফুলঝুড়ি। কেউ শুনায় আদর্শের সবক। কারো থেকে পাই আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করণ। কিন্তু কোরআন মমিনের যে পরিচয় তুলে ধরেছে, সেই মুমিন আমি খোঁজে পাই না।

আজ অশান্ত এ সমাজে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত করতে হলে আমাদের কোরআনের পথে ফিরে আসতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহকে আকড়ে ধরতে হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের বুঝার এবং মানার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।